চাকরির বাজারে বড় ফাঁক

প্রতি বছর দেশের শ্রমবাজারে প্রায় ২০ লাখ নতুন তরুণ-তরুণী চাকরির জন্য যুক্ত হলেও সে তুলনায় বাড়ছে না কর্মসংস্থান। এর জন্য দায়ী ব্যবসার পরিবেশ না থাকা এবং টেকসই বাণিজ্য নীতির অভাব। সোমবার পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট এবং বিশ্বব্যাংকের যৌথ আয়োজনে ব্যবসায়িক পরিবেশ বিষয়ে এক সেমিনারে এ তথ্য তুলে ধরা হয়।
অবশ্য বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার আগে বলেছে, পাঁচ বছরে ১ কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।
সরকারের প্রতিশ্রুতি রক্ষায় আমূল পরিবর্তন দরকার ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নীতি-কাঠামোর। না হলে আগের মতোই কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি দেখতে হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সেমিনারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ার পেছনে মূল কারণ হিসেবে বেসরকারি খাতে আশানুরূপ বিনিয়োগ না হওয়ার বিষয়টি চিহ্নিত করা হয়। এই বিনিয়োগ খরা বা স্থবিরতার পেছনে সরাসরি দায়ী বৈরী ও জটিল ব্যবসায়িক পরিবেশ। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, গ্যাস-বিদ্যুতের তীব্র সংকট, নীতিগত ধারাবাহিকতার অভাব এবং বাজারের অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতার কারণে বিনিয়োগকারীরা নতুন পুঁজি খাটানো থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। ফলে পুঞ্জীভূত বেকারের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে দারিদ্র্য বিমোচন ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, আমাদের উন্নয়ন মডেলে কর্মসংস্থান একেবারেই নেই। যা আছে, সেগুলো আবার স্বল্প মূল্যের। আমাদের বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ার জন্য বিশেষ বিশেষ খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, এটিও একটি কারণ। একটি খাতকে নীতিগত সহায়তা দেওয়ার জন্য অন্য খাত বিকশিত হতে পারেনি। এখন সময় এসেছে সরকার কর কাঠামো এবং নীতি কাঠামোয় সংস্কার করার।
সেমিনারে বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ ড. ধ্রুব শর্মা বলেন, পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে রাষ্ট্রের আর্থিক কাঠামোয় আমূল সংস্কার করা দরকার। অন্যথায় প্রবৃদ্ধি হয়তো বাড়বে, কিন্তু সে অনুযায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না। বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ এবং আইএলওর সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, দেশের কর্মসংস্থান কাঠামোয় একটি বিপরীতমুখী ও নেতিবাচক রূপান্তর ঘটছে। ২০১৬ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে কর্মক্ষম জনসংখ্যা ১ কোটি ৪০ লাখ বাড়লেও আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান বেড়েছে মাত্র ৮৭ লাখ; যার একটি বড় অংশই সংকুচিত হয়েছে উৎপাদনশীল শিল্প খাতে।
এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে বেসরকারি বিনিয়োগের ধীরগতি, তীব্র গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট এবং বাজারের ‘দ্বৈত বৈষম্য’। দেশের মাত্র ১০ শতাংশ উচ্চ উৎপাদনশীল বড় কোম্পানি মোট বিক্রির ৭৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করলেও তারা আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের মাত্র ১৫ শতাংশ তৈরি করছে, অন্যদিকে সিংহভাগ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, উচ্চ লাইসেন্সিং ফি এবং ‘টাইম ট্যাক্স’-এর জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে বড় হতে পারছে না। এই গভীর সংকট থেকে উত্তরণে বিশ্বব্যাংক শুধু জিডিপি প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর না করে অতি দ্রুত ‘স্মার্ট রেগুলেটরি সংস্কার’ ও ‘প্রতিযোগিতা নীতি’র আমূল পরিবর্তনের তাগিদ দিয়েছে।




