বাড়ছে মূল্যস্ফীতি, কমছে মজুরি
- সংকটে জনজীবন

দুশ্চিন্তা কাটছে না সাধারণ মানুষের। সামনের দিনগুলোতে কীভাবে চলবে সংসারের চাকা, এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই হিমশিম খাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতিতে নতুন করে অশনিসংকেত শোনা যাচ্ছে। জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়ায় বাড়বে সবকিছুর দাম। এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু মানুষের আয়ের কী হবে? উন্নয়ন-সহযোগী সংস্থা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) পূর্বাভাস দিয়েছে মূল্যস্ফীতি বাড়ার। এ ছাড়া খোদ বাংলাদেশ ব্যাংকও বলেছে, আসছে মূল্যস্ফীতির খড়্গ। সেই সঙ্গে বিশেষজ্ঞদেরও একই মন্তব্য। এদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য বলছে, জুলাই মাসের তুলনায় কমেছে শ্রমিকের মজুরি হার। এমনিতেই মজুরি হার যেটুকু বাড়ে, এর চেয়ে অনেক বেশি হারে বাড়ে মূল্যস্ফীতি।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এইচ এম সফিকুজ্জামান আগামীর সময়কে বলেছেন, সরকার কি জনগণের কষ্ট বোঝে? জনগণের নীরব কান্না সরকারের কানে পৌঁছাচ্ছে না। চুরি, চাঁদাবাজি, দখলদারি তো বন্ধ হয়নি। এমনিতেই মানুষ অতিষ্ঠ। এ অবস্থায় জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়ানোয় পরিবহনসহ সবক্ষেত্রেই বেড়েছে খরচ। মূল্যস্ফীতি বাড়াটাই স্বাভাবিক। ব্যবসায়ীরা এমনিতেই দাম বাড়ানোর অজুহাত খোঁজে। এর ওপর জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে ব্যবসায়ীদের নিত্যপণ্যসহ সব ধরনের জিনিসপত্রের দাম বাড়ানোর সুযোগ করে দিয়েছে সরকার।
তিনি জানালেন, বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, বাজারে কঠোর মনিটরিং করা হবে। কিন্তু সে রকম কোনো কার্যক্রম তো চোখে পড়ছে না। এ ছাড়া টিসিবিরও সক্ষমতা খুব বেশি নেই। যেটুকু পণ্য বিক্রি করতে পারে, সেখানেও ডিলারসহ নানা স্থানে অনিয়ম হয়।
সূত্র জানিয়েছে, গত বুধবার এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আপডেট সেপ্টেম্বর প্রকাশ করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। জুলাই মাসে এ পূর্বাভাস ছিল ৮.৮ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি বাড়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়া, সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি চাপ এবং মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘায়িত সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা। এ ছাড়া নতুন বেতন স্কেল কার্যকর, জ্বালানি ঘাটতি এবং এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব।
সংস্থাটি বলেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যেখানে মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ শতাংশ, সেখানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে প্রায় ৮.৭ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি বেড়ে আবার ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এ ছাড়া নানা কারণে মূল্যস্ফীতি আরও কিছুদিন চড়া থাকতে পারে।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের মনিটরি পলিসি কমিটি (এমপিসি) বলেছে, মূল্যস্ফীতিতে নতুন করে চাপ সৃষ্টি করতে পারে, এমন কয়েকটি প্রধান ঝুঁকি চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘায়িত সংঘাত বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে অস্থিতিশীল রেখেছে। একই সঙ্গে দেশে সরকারের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোকেও ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
রাজধানীর পশ্চিম শেওড়াপাড়া শামীম সরণির বাসিন্দা স্বর্ণা বেগম আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘আমার স্বামী রিকশা চালান। আর আমি অন্যের বাড়িতে কাজ করি। আমার তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে বর্তমানই চলতে কষ্ট হচ্ছে। জিনিসপত্রের দাম আরও বাড়লে কী দিয়ে কী করব বুঝতে পারছি না।’
বিবিএসের কনজ্যুমারস প্রাইস ইনডেক্স প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত আগস্ট মাসে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮.২৬ শতাংশে, যা জুলাই মাসে ছিল ৮.৩২ শতাংশ। এ ছাড়া খাদ্যপণ্যেও মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৭.০২, যা তার আগের মাসে ছিল ৭.১৬। এ ছাড়া খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি আগস্টে হয়েছে ৯.৩২, যা জুলাই মাসে ছিল ৯.২৮ শতাংশ।
এদিকে কমছে শ্রমিকের মজুরি হার। গত আগস্টে মজুরি কমে দাঁড়িয়েছে ৮.০৫ শতাংশে, যা জুলাই মাসে ছিল ৮.২২ শতাংশ। এক্ষেত্রে কৃষিতে মজুরি কমে হয়েছে ৮.০৭ শতাংশ, যা তার আগে মাসে ছিল ৮.২৪ শতাংশ। শিল্প খাতে ৭.৯৫ শতাংশ, যা জুলাইতে ছিল ৮.১২ শতাংশ। এ ছাড়া সেবা খাতেও মজুরি হার কমে হয়েছে ৮.২৫ শতাংশ, যা জুলাইতে ছিল ৮.৩৯ শতাংশ।



