বাগেরহাটের সেই এইচএসসি পরীক্ষার্থীর পাশে শিক্ষামন্ত্রী

এইচএসসি পরীক্ষার্থী মো. ইকন। ছবি: আগামীর সময়
বিকালে বাবার দাফন, রাতে এটিএম বুথের কাজ শেষে পরদিন এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া মো. ইকনের পাশে দাঁড়িয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। গতকাল বুধবার রাতে বাগেরহাটের এই তরুণের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন শিক্ষামন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) ফারহান ইশতিয়াক।
তিনি জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে শিক্ষামন্ত্রী ইকনের সঙ্গে কথা বলবেন। তাৎক্ষণিক প্রয়োজন বিবেচনায় ছেলেটিকে দ্রুত আর্থিক সহায়তা পাঠানোর নির্দেশনাও দিয়েছেন মন্ত্রী।
পিএস ফারহান বলেছেন, ‘ইকনের খবরটি আমাদের নজরে এসেছে। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখেছেন শিক্ষামন্ত্রী। আপাতত তার জন্য আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। পরীক্ষা শেষে যেন অর্থাভাবে তার পড়াশোনা বন্ধ না হয়, সে বিষয়েও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।’
বিভিন্ন মাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর ইকনের জীবনসংগ্রামের গল্প আলোড়ন তোলে। দেশ-বিদেশ থেকে অসংখ্য মানুষ তার খোঁজখবর নেন। আগ্রহ জানান সহযোগিতার।
আজ বৃহস্পতিবার সকাল ১১টার দিকে নিজ কার্যালয়ে জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন ইকনের হাতে তুলে দেন আর্থিক সহায়তা। সদর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেওয়া হয় নগদ অর্থ, খাদ্যসামগ্রীসহ প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মেজবাউদ্দিন, বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোসা. আতিয়া খাতুনসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা।
ইকনের বড় মামা মানিক মোল্লা বললেন, ‘আমাদের পরিবারের জন্য এটি খুবই কঠিন সময়। ইকনের বাবা মারা যাওয়ার পর পরিবারের সব দায়িত্ব হঠাৎ করেই ওর কাঁধে এসে পড়েছে। কিন্তু এত প্রতিকূলতার মধ্যেও ইকন পড়াশোনা ছাড়েনি। শিক্ষামন্ত্রী তার লেখাপড়ার দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এতে আমরা পরিবারের পক্ষ থেকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই। একই সঙ্গে যারা ইকনের খবরটি প্রকাশ করেছেন এবং সংবাদটি দেখে পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাদের প্রতিও আমরা কৃতজ্ঞ। আমরা বিশ্বাস করি, সবার সহযোগিতায় ইকন তার পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারবে এবং একদিন বাবার স্বপ্ন পূরণ করবে।’
ইকন জানিয়েছেন, অর্থাভাবে তিনি এ বছর প্রয়োজনীয় বইও কিনতে পারেননি। নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে তিনি কোরিয়ান ও চীনা ভাষা শিখেছেন, যাতে ভবিষ্যতে ভালো কোনো কর্মসংস্থানের সুযোগ পান। ইকনের ভাই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মাথায় আঘাত পেয়ে ভারসাম্যহীন হয়ে গেছে। তাদের মা তাকে দেখাশোনা করেন।
‘সংসারে বাবাই একমাত্র উপার্জন করতেন। বাবার ওপর চাপ কমানোর জন্যই আট হাজার টাকা বেতনে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এটিএম বুথে চাকরি নিয়েছিলাম। কখনো বাবাকে আমার পড়াশোনার খরচ নিয়ে চাপ দিতে চাইনি। বাবা আমাদের সুখের জন্য সারাজীবন কষ্ট করেছেন। কিন্তু হঠাৎ করেই বাবা চলে গেলেন। বাবাকে হারানোর কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। যার বাবা নেই, সে-ই শুধু বাবা হারানোর বেদনা বুঝতে পারে। বাবা আমাদের জীবনের বটগাছ,’ বললেন ইকন।
তিনি মন্তব্য করেন, আমি কখনো ভাবিনি আমার জীবনের গল্প এভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে। শিক্ষামন্ত্রী স্যার আমার পড়াশোনার দায়িত্ব নেবেন। এ কথা শুনে নতুন করে সাহস পেয়েছি। যারা আমার সংগ্রামের গল্প মানুষের সামনে তুলে ধরেছেন এবং যারা পাশে দাঁড়িয়েছেন, সবার প্রতি আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। আমি সবার দোয়া চাই, যেন লেখাপড়া শেষ করে একজন ভালো মানুষ হতে পারি এবং পরিবারের দায়িত্ব নিতে পারি।
বাগেরহাট শহরের মুনিগঞ্জ মেডিকেল স্কুল রোড এলাকার বাসিন্দা ইকন। মা ও মানসিক ভারসাম্যহীন এক ভাইকে নিয়ে চার হাজার টাকার একটি ভাড়া বাসায় থাকেন তিনি।
গত মঙ্গলবার ভোরে অসুস্থ হয়ে পড়েন ইকনের বাবা ইসরাফিল দাড়িয়া (৪৫)। ওইদিন সকাল ৬টার দিকে বাগেরহাট ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন তাকে। মঙ্গলবার গোপালগঞ্জে গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয় ইসরাফিলকে। ইকনের বাবা মোটরসাইকেল চালিয়ে রোজগার করতেন।
বাগেরহাট খান জাহান আলী ডিগ্রি কলেজের মানবিক বিভাগ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছেন ইকন। পাশাপাশি রেলরোড এলাকায় কৃষি ব্যাংকের একটি এটিএম বুথে রাতের শিফটে খণ্ডকালীন চাকরি করেন। তার বেতন ৮ হাজার টাকা।
বাবার দাফন শেষে ওইদিন রাতেই তিনি কাজে যান। রাত ১০টার দিকেও তাকে এটিএম বুথে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। আর পরদিন বুধবার বসেন এইচএসসি পরীক্ষায়।
ইকনের দাদার বাড়ি গোপালগঞ্জে হলেও বাগেরহাটের বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডে গাড়িচালকের কাজ করতেন ইকনের দাদা। চাকরি থেকে অবসরের পর দাদা গোপালগঞ্জে ফিরে গেলেও ইসরাফিল বাগেরহাটেই থেকে যান।






