ইকনের জীবনসংগ্রাম
বাবার দাফন শেষে রাতেই ডিউটি, পরদিন এইচএসসি পরীক্ষা

এইচএসসি পরীক্ষার্থী মো. ইকন। ছবি: আগামীর সময়
বাবাকে শেষ বিদায় জানিয়ে বিকালে সম্পন্ন করেছেন দাফন। শোকের ভারে ন্যুব্জ পরিবারকে সময় দেওয়ারও সুযোগ মেলেনি। রাত নামতেই হাতে বই নিয়ে ছুটতে হয়েছে এটিএম বুথের ডিউটিতে। কারণ সংসারের দায় তার কাঁধে। আর ঠিক পরদিন সকালেই অংশ নিতে হচ্ছে উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষায়। একদিকে বাবাকে হারানোর বেদনা, অন্যদিকে জীবিকার তাগিদ ও ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন—এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে অনন্য এক জীবনসংগ্রামের গল্প লিখছেন বাগেরহাটের এইচএসসি পরীক্ষার্থী মো. ইকন।
বাগেরহাট শহরের মুনিগঞ্জ মেডিকেল স্কুল রোড এলাকার বাসিন্দা ইকন। সদ্য প্রয়াত বাবাকে হারানোর গভীর শোক বুকে নিয়েই তাকে এখন সামলাতে হচ্ছে সংসারের দায়িত্ব, চাকরি ও শিক্ষাজীবন।
ইকনের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, গতকাল মঙ্গলবার ভোরে অসুস্থ হয়ে পড়েন ইকনের বাবা ৪৫ বছর বয়সী ইসরাফিল দাড়িয়া। সকাল ৬টার দিকে বাগেরহাট ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন তাকে।
গতকাল জোহরের নামাজের পর মুনিগঞ্জ দোতলা জামে মসজিদে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে গোপালগঞ্জে গ্রামের বাড়িতে মায়ের কবরের পাশে দাফন করা হয় ইসরাফিলকে।
পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, ইকনের বাবা মোটরসাইকেল চালিয়ে রোজগার করতেন। ইকনের বড় ভাই ইমনও একসময় মোটরসাইকেল চালাতেন। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। এরপর থেকেই পরিবারের একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠেন ছোট ছেলে ইকন।
বাগেরহাট খান জাহান আলী ডিগ্রি কলেজের মানবিক বিভাগ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছেনস ইকন। পাশাপাশি রেলরোড এলাকায় কৃষি ব্যাংকের একটি এটিএম বুথে রাতের শিফটে খণ্ডকালীন চাকরি করেন।
বাবার দাফন শেষে গতকাল রাতেই তিনি কাজে যান। রাত ১০টার দিকেও তাকে এটিএম বুথে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। চোখে বাবাকে হারানোর অশ্রু, হৃদয়ে গভীর শোক—তবু থেমে থাকেননি তিনি।
বাগেরহাট খান জাহান আলী ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ খোন্দকার আছিফ উদ্দিন রাখী বলেছেন, ‘ইকন আমাদের কলেজের ছাত্র। তার জীবনের এই কঠিন মুহূর্ত আমাদের সবাইকে ব্যথিত করেছে। এত বড় ব্যক্তিগত শোকের মধ্যেও সে দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়ে পরীক্ষার প্রস্তুতি ও চাকরি চালিয়ে যাচ্ছে, যা সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক। কলেজের পক্ষ থেকে আমরা তার পাশে আছি। প্রয়োজনে তাকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে। আমরা তার প্রয়াত বাবার রুহের মাগফিরাত কামনা করছি এবং ইকনের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করছি।’
ইকনের এই সংগ্রামের গল্প এরই মধ্যে স্থানীয়দের আবেগাপ্লুত করেছে। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও দায়িত্ববোধ, পরিবারকে আগলে রাখার চেষ্টা এবং শিক্ষাজীবন চালিয়ে যাওয়ার অদম্য ইচ্ছাশক্তি অনেকের কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে।





