বৃক্ষরোপণ নাকি ভবিষ্যতের ঝুঁকি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
পরিবেশ রক্ষায় সড়কের পাশে লাগানো হচ্ছে গাছ। কিন্তু সেই গাছই যদি ভবিষ্যতে সড়কের নিরাপত্তা ও স্থায়িত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে উদ্যোগটির যৌক্তিকতা থাকল কই? খুলনার পাইকগাছা পৌরসভায় প্রায় ১১ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত কয়েকটি সড়কের পিচঢালাই থেকে মাত্র এক থেকে দুই ফুট দূরে লাগানো হয়েছে গাছের চারা। এতে যানবাহন চলাচলে বাধা, দুর্ঘটনা এবং সড়কের পিচঢালাই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
অবশ্য ঠিকাদারের দাবি, কর্তৃপক্ষের নকশা অনুযায়ীই কাজ হয়েছে। কিন্তু সেই নকশা কোথায়, কারা অনুমোদন করেছেন— তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা মিলছে না। ফলে পরিবেশবান্ধব উদ্যোগের আড়ালে ভবিষ্যতের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে।
পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাঁকড়া সমিতির অফিস থেকে পুরনো খাদ্যগুদাম পর্যন্ত এবং ৯ নম্বর ওয়ার্ডের শিববাটি থেকে লোনাপানি কেন্দ্রের বাউন্ডারির স্লুইসগেট পর্যন্ত বিসি সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া ২ নম্বর ওয়ার্ডে খালেক কাসারির বাড়ি থেকে লোনাপানি কেন্দ্রের গেট পর্যন্ত নির্মিত হয়েছে আরসিসি সড়ক। এসব সড়কের দুই পাশেই চারা রোপণ করা হয়েছে। সড়কের এত কাছে গাছ লাগানোর ফলে ভবিষ্যতে কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গাছ বড় হলে শাখা-প্রশাখা সড়কের দিকে বিস্তৃত হয়ে যানবাহন চলাচলে বাধা দিতে পারে। কোনো যানবাহন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের বাইরে চলে গেলে কাছাকাছি থাকা গাছের সঙ্গে সংঘর্ষের ঝুঁকিও রয়েছে। পাশাপাশি গাছের শিকড়ের বিস্তারে সড়কের পিচঢালাই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
পৌরসভার উপসহকারী প্রকৌশলী সুমন দাশ অবশ্য জানিয়েছেন, প্রকল্পের নির্দেশনা অনুযায়ী সড়কের প্রান্ত থেকে ৬০০ মিলিমিটার বা প্রায় দুই ফুট দূরত্বে চারা রোপণের কথা। একটি গাছ থেকে অন্য গাছের দূরত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে তিন মিটার বা প্রায় ১০ ফুট। তার ভাষ্য, কারিগরি নির্দেশনা অনুসরণ করেই বৃক্ষরোপণের কাজ করার কথা।
প্রকল্পের তথ্য বলছে, পৌরসভার ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সংশ্লিষ্ট সড়ক নির্মাণকাজে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১১ কোটি ৮০ লাখ টাকা। উপকূলীয় শহর জলবায়ু সহনশীল প্রকল্পের (সিটিসিআরপি) আওতায় কাজটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় বসু এন্টারপ্রাইজ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
প্রতিষ্ঠানটির এক প্রতিনিধির ভাষ্য, সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি প্রকল্পের আওতায় বৃক্ষরোপণের কাজও অন্তর্ভুক্ত ছিল। কর্তৃপক্ষের দেওয়া নকশা অনুযায়ীই তারা কাজ করেছেন। নকশায় সড়কের দুই ফুট প্রশস্ত সোল্ডারের মাঝখানে গাছ লাগানোর নির্দেশনা ছিল। সে অনুযায়ী নির্ধারিত স্থানে চারা রোপণ করা হয়েছে।
তার এই বক্তব্যের পর প্রকল্পের নকশা প্রণয়ন ও অনুমোদনের বিষয়টি সামনে এসেছে। সড়কের সোল্ডারের মাঝখানে গাছ লাগানোর নির্দেশনা কে দিয়েছেন, কারা নকশা অনুমোদন করেছেন এবং বৃক্ষরোপণের স্থান নির্ধারণের সময় সড়কের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল কি না, সেসব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি।
প্রকল্পের অনুমোদিত নকশা ও বৃক্ষরোপণের কারিগরি পরিকল্পনা জানতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোয় যোগাযোগ করা হলেও, তা পাওয়া যায়নি। এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ফলে নকশাটি কোন দপ্তরে সংরক্ষিত, বৃক্ষরোপণের স্থান কারা নির্ধারণ করেছেন এবং কাজ চলাকালে কারা তদারকি করেছেন, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে পাইকগাছা পৌরসভার অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা পৌর প্রকৌশলী মোহাম্মদ নুর আহমদের ভাষ্য, নিয়ম মেনেই গাছগুলো লাগানো হয়েছে। তবে বৃক্ষরোপণের স্থান নির্ধারণে কোনো সমস্যা রয়েছে কি না, তা যাচাই করে দেখবেন।
পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াসিউজ্জামান চৌধুরীর সঙ্গে খুদে বার্তায় যোগাযোগ করা হলেও তিনি এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেননি।
সংশ্লিষ্ট সড়কগুলোয় গাছের অবস্থান, প্রজাতি, শিকড়ের বিস্তার ও ভবিষ্যৎ উচ্চতা বিবেচনায় প্রকৌশলগত পরিদর্শন প্রয়োজন। এতে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। প্রয়োজন হলে সেসব চারা উপযুক্ত দূরত্বে আবার রোপণের ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে প্রকল্পের অনুমোদিত নকশা, বৃক্ষরোপণের কারিগরি পরিকল্পনা এবং কাজের তদারকির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের বিষয়টিও স্পষ্ট করা জরুরি— মনে করেন স্থানীয়রা।
তাদের মতে, পরিবেশ রক্ষায় সড়কের পাশে বৃক্ষরোপণ গুরুত্বপূর্ণ। তবে সেই উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সড়কের নিরাপত্তা, জনসাধারণের চলাচল এবং অবকাঠামোর স্থায়িত্বও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যদি কর্তৃপক্ষের নকশা অনুযায়ী কাজ করে থাকে, তাহলে নকশার যৌক্তিকতা ও অনুমোদনের বিষয়টি ব্যাখ্যা করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষেরই। প্রায় ১১ কোটি ৮০ লাখ টাকার প্রকল্পে নির্মাণকাজের পাশাপাশি জননিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।




