খুলনায় আজমলকে পিটিয়ে হত্যা
যাকে মূল আসামি বলছেন বাদী, তার নামই নেই মামলায়

সংগৃহীত ছবি
খুলনায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আজমুল হোসেনকে একটি মেসে পিটিয়ে ও ছাদ থেকে ফেলে হত্যার অভিযোগে মামলা করেছেন তার বাবা কুতুব উদ্দিন। তবে মূল অপরাধী হিসেবে যাকে তিনি চিহ্নিত করেছেন, তার নাম নেই এজাহারে।
কুতুব উদ্দিনের দাবি, আজমুলের হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ওই মেসের ম্যানেজার মেহেদী। তার আগে পিকনিকের কথা বলে টাকাও নিয়েছিলেন।
তাহলে এজাহারে মেহেদীর নাম না রাখা নিয়ে কুতুব উদ্দিন বলছেন, গতকাল শনিবার রাতে মামলা করার সময় তিনি ‘বুঝতে’ পারেননি। এখন মেহেদীর নাম যুক্ত করতে চান।
এদিকে পুলিশ বলছে, মামলার পর এখন তদন্তে মেহেদীর নাম এলে তার নামও আসামির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।
গত শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) রাতে নগরীর খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের খানজাহান আলী আবাসিক হলের পেছনে ইসলামনগর রোডের একটি চারতলা মেসের বাইরে পাওয়া যায় আজমুলের মরদেহ। তিনি ছিলেন নগরীর নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র। ওই মেসেই তিনি থাকতেন।
গতকাল শনিবার রাতে খুলনা মহানগরীর হরিণটানা থানায় মামলা করেন নিহতের বাবা কুতুব উদ্দিন। এজাহারে চারজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ২০ থেকে ২৫ জনকে আসামি করা হয়।
আসামিদের মধ্যে যাদের নাম উল্লেখ করা হয়, তারা হলেন- খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিসারিজ অ্যান্ড মেরিন রিসোর্স টেকনোলজি বিভাগের ছাত্র মো. রবীন (২০) ও মো. মুবিন (২২), গণিত বিভাগের ছাত্র মো. সাগর (২২) ও অ্যাগ্রোটেকনোলজি বিভাগের ছাত্র মো. ওবায়দুল (২২)।
এজাহারের উদ্ধৃতি দিয়ে হরিণটানা থানার ওসি মো. ইকবাল হোসেন জানিয়েছেন, ভাত চুরির অপবাদ দিয়ে আজমুলকে পিটিয়ে ছাদ থেকে ফেলে মারা হয়।
ওই মেসের রাঁধুনী ফাতেমা সেদিন বলেছিলেন, আজমুলের বিরুদ্ধে এর আগে টাকা ও ল্যাপটপ চুরির অভিযোগ ছিল। তবে শুক্রবার রাতে ভাত চুরি করে খাওয়ার অভিযোগে মেসের ছাত্র ও বহিরাগতরা তাকে মারধর করেন।
তবে কুতুব উদ্দিনের দাবি, ভাত চুরির অপবাদ দিয়ে তার ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে।
‘আমার ছেলের হত্যাকাণ্ডের মূল অপরাধী ওই মেসের ম্যানেজার মেহেদী। তার নেতৃত্বেই আমার ছেলেকে নির্মমভাবে পিটিয়ে ও চারতলার ছাদ থেকে নিচে ফেলে দিয়ে হত্যা করা হয়েছে,’ বলছিলেন তিনি।
আজমুলের বাড়ি চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার দর্শনা থানার বড় শলুয়া গ্রামে। তিনি শুক্রবার দুপুরে বাড়ি থেকে রওনা হয়ে খুলনায় মেসে আসার পর রাতেই হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।
কুতুব উদ্দিনের ভাষ্য, মেহেদীই ফোন করে মেসে ফিরতে বলেছিলেন আজমুলকে। তখন পিকনিকের জন্য ৩০ হাজার টাকা বিকাশে পাঠাতে বলেছিলেন।
‘আমার ছেলে বাড়িতে ছিল। পিকনিকের জন্য টাকা লাগবে বলে তার কাছে কল দিয়ে টাকা চায় মেহেদী। শুক্রবার সন্ধ্যার মধ্যে মেসে চলে আসতে বলে। ওই ফোন পেয়ে আজমুল ২৩ হাজার টাকা বিকাশ করে। এরপর দুপুরে সে বাড়ি থেকে খুলনার উদ্দেশে রওনা দেয়,’ বলছিলেন কুতুব উদ্দিন।
আজমুল প্রাইভেট পড়িয়ে ‘বেশ টাকা’ আয় করতেন বলে জানান তার বাবা। ছেলের বিকাশ অ্যাকাউন্টে ৫৮ হাজার টাকা থাকার তথ্যও দেন তিনি।
কুতুব উদ্দিনের দাবি, মেহেদীকে গ্রেপ্তার করা গেলেই আজমুল হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উন্মোচন হবে।
‘আমার ছেলের কাছ থেকে যেই মেহেদী বিকাশে টাকা নিল, সেই মেহেদীই ভাত চুরির অপবাদ দিয়ে আমার ছেলেটাকে হত্যা করেছে।’
মেহেদীর নাম কেন মামলায় দেননি? প্রশ্নে কুতুব উদ্দিনের জবাব আসে, ‘আসলে বুঝতে পারি নাই মামলার বিষয়টা। মামলাই করতে চাই নাই। গরিব মানুষ আমরা। পরে সবাই পরামর্শ দিল, তাই মামলা করেছি। এখন মেহেদীর নামটা দিতে চাই।’
তবে মামলা নথিভুক্ত হওয়ার পর এই পর্যায়ে আসামির তালিকায় নতুন করে কারও নাম দেওয়ার সুযোগ নেই বলে জানাচ্ছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।
ওসি ইকবাল বললেন, ‘তাৎক্ষণিকভাবে বাদী যাদের নাম বলতে পেরেছেন, তাদের নামই আসামির তালিকায় দেওয়া হয়েছে। অধিকতর তদন্তের পর অন্য কারও সম্পৃক্ততা পেলে তাদের নামও অন্তর্ভুক্ত করা হবে।’
আসামিদের কেউ দুদিনেও গ্রেপ্তার হয়নি। তবে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ও এর আশপাশে অভিযান চলছে বলে জানালেন ওসি।
আজমুল হত্যার বিচারের দাবিতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আজ বিক্ষোভ করেছেন। দুপুর ১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের হাদি চত্বরে ঘণ্টাব্যাপী এই বিক্ষোভ-সমাবেশ হয়।
শিক্ষার্থীদের দাবি, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থী এই হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকলে তাদের বিচার করতে হবে।
এদিকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে গত রাতে আজমুলের মরদেহ হস্তান্তর করা হয় পরিবারের কাছে। এরপর চুয়াডাঙ্গার বাড়িতে নিয়ে দাফন করা হয় তাকে।






