নদীবেষ্টিত জনপদে চিকিৎসার সংকট

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
নদীঘেরা বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের বসবাস। তাদের বড় একটি অংশ কৃষক ও মৎস্যজীবী। বিপুল এই জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবার প্রধান ভরসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। অথচ ৫০ শয্যার এই হাসপাতালে রোগী ভর্তি থাকেন ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ। ৫০ জন চিকিৎসকের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ছয়জন। নেই আলট্রাসনোগ্রাফি ও এক্স-রে মেশিন। বন্ধ নৌ-অ্যাম্বুলেন্সও। ফলে চিকিৎসা নিতে এসে একদিকে দীর্ঘ অপেক্ষা, অন্যদিকে জরুরি রোগী নিয়ে স্বজনদের ছুটতে হচ্ছে বরিশালে। দুর্গম জনপদটির মানুষের কাছে চিকিৎসাসেবা যেন প্রতিদিনই এক নতুন সংকটের নাম।
শুধু জনবল সংকটই নয়, রোগীর চাপও হাসপাতালটির সক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে গেছে। প্রতিদিন গড়ে ১০০ জন রোগী ভর্তি থাকেন। কোনো কোনো দিন এ সংখ্যা ১৩০-১৪০ জনেও পৌঁছে যায়। শয্যা না পেয়ে অনেকে হাসপাতালের বারান্দায় শুয়ে নিচ্ছেন চিকিৎসা। বহির্বিভাগেও প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে আসেন গড়ে ৪০০-৫০০ মানুষ।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ৩৬ জন নার্সের বিপরীতে আছেন ২১ জন। পরিচ্ছন্নতাকর্মী রয়েছেন মাত্র দুজন। আর ওয়ার্ডবয়ের কোনো পদই কার্যত নেই। ফলে সীমিত জনবল দিয়ে বিপুলসংখ্যক রোগীর সেবা নিশ্চিত করতে গিয়ে চিকিৎসক ও নার্সদের ওপর পড়ছে বাড়তি চাপ।
এই সংকটের বাস্তব চিত্র পাওয়া যায় হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের অভিজ্ঞতায়। উলানিয়ার রাজাপুর এলাকার মুবিনের ভাষায়, ‘দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করে টিকিট সংগ্রহ করতে হয়েছে। এরপর ডাক্তার দেখানোর জন্যও দীর্ঘ সময় সিরিয়ালে অপেক্ষা করতে হয়েছে।’ তার অভিযোগ, চিকিৎসক কম থাকায় রোগীর চাপ সামলাতে সময় লাগছে। কোনো পরীক্ষা দেওয়া হলে সেটিও বাড়তি টাকা দিয়ে করাতে হয় বেসরকারি ক্লিনিকে।
চিকিৎসাসেবার এই ভোগান্তির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রোগ নির্ণয়ের প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ঘাটতি। হাসপাতালে নেই আলট্রাসনোগ্রাফি ও এক্স-রে মেশিন। এমনকি সিবিসি পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সেল কাউন্টারও নেই। ফলে এসব পরীক্ষা করাতে রোগীদের যেতে হচ্ছে বেসরকারি ক্লিনিকে। এতে বেড়ে যাচ্ছে চিকিৎসার ব্যয়। বিশেষ করে দরিদ্র কৃষক ও মৎস্যজীবী পরিবারের অনেকেই অর্থের অভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কাটাছেঁড়া বা জখমের রোগী হাসপাতালে নিয়ে গেলে অনেক সময় তাদের বরিশাল শহরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। অথচ নদীবেষ্টিত মেহেন্দিগঞ্জ থেকে বরিশাল সদরে পৌঁছতে স্বাভাবিকভাবে প্রায় আড়াই ঘণ্টা সময় লাগে। দ্রুতগতির স্পিডবোট ব্যবহার করলেও সময় লাগে প্রায় এক ঘণ্টা। এমন পরিস্থিতিতে রোগী পরিবহনের জন্য নৌ-অ্যাম্বুলেন্স থাকার কথা থাকলেও সেটিও এখন কাজে আসছে না। হাসপাতালের জন্য নৌ-অ্যাম্বুলেন্স বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অবহেলা ও অযত্নে কিছুদিন পর সেটি অচল হয়ে যায়।
নৌপথের পাশাপাশি সড়কপথেও রোগী পরিবহনে সংকট রয়েছে। হাসপাতালের জন্য বরাদ্দ দুটি অ্যাম্বুলেন্সের একটি অচল। অন্যটিও চলছে জরাজীর্ণ অবস্থায়। ফলে একটি অ্যাম্বুলেন্স দিয়েই পুরো উপজেলার রোগী পরিবহনের কাজ চালাতে হচ্ছে।
জরুরি চিকিৎসা নিয়ে এমন ভোগান্তির অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন পাতারহাট বন্দরের বাসিন্দা সাকিব। তিনি বললেন, ‘আমার মেয়ের হাত কেটে গেলে নেওয়া হয় মেহেন্দিগঞ্জ হাসপাতালে। সেখান থেকে বলা হয় বরিশালে নিয়ে যেতে। প্রায় দুই ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর একজন ওয়ার্ডবয় মেয়ের হাত সেলাই করে দেন।’
সাকিবের প্রশ্ন, মেহেন্দিগঞ্জ হাসপাতালের একজন চিকিৎসক যে সেবা দিতে পারলেন না, একই সেবা বরিশালের একজন ওয়ার্ডবয় কীভাবে দিলেন।
অবশ্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও অস্বীকার করছে না সমস্যাগুলোর কথা। মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ ইমরানুর রহমানের ভাষ্য, ‘প্রয়োজনের তুলনায় হাসপাতালে জনবল সংকট। ৫০ জন চিকিৎসকের বিপরীতে কর্মরত আছেন ছয়জন। এ ছাড়া নার্স, আয়া, ওয়ার্ডবয়, ল্যাব অ্যাটেনডেন্টসহ গুরুত্বপূর্ণ পদেও রয়েছে জনবল সংকট। সীমিত জনবলে সেবা দিতে গিয়ে বিলম্ব হচ্ছে কিছুটা।’
বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে বলেও দাবি করেছেন ডা. মোহাম্মদ ইমরানুর রহমান। ‘শূন্য পদে জনবল নিয়োগের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং বরিশাল বিভাগীয় পরিচালককে (স্বাস্থ্য) চিঠি পাঠানো হয়েছে’— বললেন তিনি।
চিকিৎসা সরঞ্জাম সংকটের বিষয়টিও স্বীকার করেন এই কর্মকর্তা। তিনি বললেন, ‘হাসপাতালে আলট্রাসনোগ্রাফি ও এক্স-রে মেশিন নেই। সেল কাউন্টার না থাকায় সিবিসিসহ অনেক পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না।’
হাসপাতালের বর্তমান অবস্থা জেনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন বরিশাল বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. রেফায়েতুল হায়দার।




