ডিঙ্গোপুতা হাওরে অবাধে শামুক নিধন, হুমকিতে জীববৈচিত্র্য

তেতুলিয়া সড়কে নৌকার শামুক বিক্রির জন্য বস্তায় ভরে রাখা হয়েছে। ছবি: আগামীর সময়
নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার ডিঙ্গোপুতা হাওরে অবাধে শামুক সংগ্রহ চলছে বর্ষা মৌসুমজুড়েই। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ শামুক তুলে বিক্রি করা হচ্ছে। এর পেছনে জড়িত স্থানীয় ব্যক্তি ও চক্র। এতে হুমকির মুখে পড়েছে হাওরের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য।
পরিবেশবিদ ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এভাবে শামুক নিধন চলতে থাকলে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে জলজ প্রাণীর খাদ্যশৃঙ্খল ও প্রজনন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বর্ষার শুরু থেকে শামুক সংগ্রহ ও বিক্রি অব্যাহত রয়েছে উপজেলার বিভিন্ন হাওরে। হাঁসের খামার ও মাছ চাষে শামুকের চাহিদা থাকায় স্থানীয়ভাবে বেড়েছে এর বেচাকেনাও। ভাসান পানির মৌসুমে ডিঙ্গোপুতা হাওরের বিভিন্ন জলমহালে মাছ ধরার পাশাপাশি শামুক সংগ্রহ করছেন অনেকেই।
স্থানীয়দের দাবি, প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০টি নৌকায় প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ ক্যারেট, অর্থাৎ প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ বস্তা শামুক সংগ্রহ করা হচ্ছে। এসব শামুকের বাজারমূল্য প্রায় ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা।
তেতুলিয়া গ্রামের শামুক সংগ্রহকারী রাজীব আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, মোহনগঞ্জের বিভিন্ন হাঁস খামারি ও মৎস্যচাষিরা আগেই শামুকের অর্ডার দেন। এরপর রাতভর হাওর থেকে শামুক সংগ্রহ করে নৌকায় ঘাটে আনা হয়। পরে রাস্তার পাশে বস্তাবন্দি করে বিক্রি করা হয়।
তিনি জানান, প্রতি ক্যারেট শামুক ১৫০ টাকায় বিক্রি হয়। আড়াই ক্যারেট শামুকে একটি বস্তা পূর্ণ হয়, যার দাম ৩০০ থেকে ৩৭৫ টাকা।
মোহনগঞ্জ উপজেলার বিস্তীর্ণ ডিঙ্গোপুতা হাওরে শামুক সংগ্রহ চলে রাত থেকে ভোর পর্যন্ত। তেতুলিয়া ইউনিয়নের টলারঘাট এলাকায় নৌকা থেকে শামুক নামিয়ে রাখা হয় স্তূপ করে। পরে হাঁস খামারি ও মাছচাষিরা সেগুলো কিনে নিয়ে যান জেলার বিভিন্ন উপজেলায়। শামুক সংগ্রহে নিয়োজিত শ্রমিকদেরও দেওয়া হয় মজুরি।
সরেজমিনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিরামপুর গ্রামের এক হাঁস খামারি জানিয়েছেন, প্রতিদিন এখান থেকে হাঁসের খাদ্যের জন্য শামুক কিনে নিয়ে যান তিনি। এ সময় দেখা যায়, অগ্রিম অর্ডার করা শামুক বস্তাবন্দি করে পাঠানো হচ্ছে কলমাকান্দা উপজেলায়।
সোমবার সকালে তেতুলিয়া গ্রামে গিয়ে শামুক বস্তাবন্দির কাজে নিয়োজিত কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তারা এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অবাধে শামুক সংগ্রহ হলেও সম্প্রতি এ বিষয়ে কোনো অভিযান, মামলা বা ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম চোখে পড়েনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শামুক জলজ বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি বিভিন্ন মাছ, পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর খাদ্য এবং জলাশয়ের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নির্বিচারে শামুক সংগ্রহের ফলে জলজ প্রাণীর প্রজনন, খাদ্যশৃঙ্খল ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ অনুযায়ী অনুমতি ছাড়া বন্য প্রাণী শিকার, সংগ্রহ, ধ্বংস, ক্রয়-বিক্রয় বা পরিবহন নিষিদ্ধ। একই বছরের ১০ জুলাই প্রকাশিত সরকারি প্রজ্ঞাপনে বন্য প্রাণী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে শামুককে। আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান আছে।
তবে মৎস্য সংরক্ষণ আইনে শামুক সংগ্রহ নিয়ে সুনির্দিষ্ট বিধান না থাকায় মৎস্য বিভাগ কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
তেতুলিয়া ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. বজলু মিয়া আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, তিনি একাধিকবার শ্যামপুর, নোয়াপাড়া ও তেতুলিয়া এলাকার শামুক সংগ্রহকারীদের সতর্ক করেছেন। তাদের জানানো হয়েছে, শামুক ধরা দণ্ডনীয় অপরাধ। গত বছরের তুলনায় এ বছর কিছুটা কমলেও সচেতনতা বাড়াতে প্রয়োজন মাইকিং।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা অনিক রহমান আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, বিষয়টি তাদের নজরে রয়েছে। সম্প্রতি অন্য একটি ঘটনায় প্রায় ১ হাজার ২০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ায় কিছুটা জটিলতা তৈরি হয়েছে। তবে আবারও অভিযান চালানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তিনি জানান, শামুক মৎস্য খাতে নয়, মূলত প্রাণীসম্পদ খাতে ব্যবহৃত হয়। তাই এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শামুক নিধন জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর এবং বিষয়টি পরিবেশগত দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।
মোহনগঞ্জ উপজেলা প্রাণীসম্পদ কর্মকর্তা উৎপল কুমার সরকার আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, শামুক বিষয়ে তাদের দপ্তর কাজ করে না। এ বিষয়ে মৎস্য বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিয়েছেন।
বন বিভাগের নেত্রকোনা সহকারী কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (এসএফএনটিসি) আব্দুর রফিক আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, বিষয়টি বন বিভাগের আওতাভুক্ত নয়। এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর প্রয়োজনীয় মতামত দিতে পারবে।
নেত্রকোনা বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা রামকৃষ্ণ আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, শামুক হাওরাঞ্চলের জলজ প্রাণীর জীবনচক্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নির্বিচারে শামুক সংগ্রহ চলতে থাকলে হাওরের জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে শামুকের প্রজনন ব্যাহত হবে, মাছের খাদ্য কমে যাবে এবং ভবিষ্যতে মাছের উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
মোহনগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমেনা খাতুন আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, বিষয়টি তিনি খতিয়ে দেখবেন। এ বিষয়ে আইনি দিকও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।





