টিস্যু কালচার ল্যাব কি নতুন শ্বেতহস্তী
- বান্দরবানে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় চারতলা ভবন
- পড়ে রয়েছে ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হিমাগার
- ল্যাব নির্মাণে ব্যয় ১৬ কোটি ৪৬ লাখ টাকা
- অতীতে অনেক প্রকল্পই প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি
- নতুন প্রকল্পের ক্ষেত্রেও রয়ে গেছে সংশয়

ছবি: আগামীর সময়
কৃষি উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে বান্দরবানে প্রায় ১৬ কোটি ৪৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে আধুনিক টিস্যু কালচার ল্যাব। তবে প্রকল্পটির প্রয়োজনীয়তা, স্থান নির্বাচন এবং ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে এরই মধ্যে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। পাহাড়ি ভূমির মতো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পাইল লোড টেস্ট না করেই ভবনটির চারতলা নির্মাণকাজ শেষ করা হয়েছে বলেও রয়েছে অভিযোগ। অন্যদিকে কৃষিপণ্য সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে এর আগে প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি হিমাগার দীর্ঘদিন ধরে পড়ে রয়েছে অকার্যকর অবস্থায়। ফলে নতুন এ প্রকল্পটিরও শেষ পর্যন্ত একই পরিণতি হবে কি না, তা বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন অনেকেই।
বান্দরবান শহরের বালাঘাটায় নির্মিত গোলাকার আকৃতির চারতলা ভবনের কাজ শেষ পর্যায়ে। ভবনে এখন কাচ বসানো ও বৈদ্যুতিক সংযোগের কাজ চলছে।
প্রকল্পের সাইট ইঞ্জিনিয়ার নোবেল চাকমা জানিয়েছেন, সাড়ে আট হাজার বর্গফুটের বেশি আয়তনের ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে প্রায় ৮০ শতাংশ। তার ভাষ্য, আগামী জুলাইয়ের মধ্যে ভবনটি ব্যবহারের উপযোগী হবে।
নির্মাণসংশ্লিষ্টরা বলছেন, শঙ্খ নদীর পাড় এলাকায় পাহাড়ি ভূমি অবিন্যস্ত। প্রতি বছরই এখানকার কোনো না কোনো জায়গায় পাহাড়ধসের মতো ঘটনা ঘটে। তাই পাহাড়ে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে কিছু বাড়তি সতর্কতা নেওয়া হয়।
প্রকল্পের তথ্য বলছে, টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন প্রকল্পের আওতায় ২০২৪ সালের ৫ ডিসেম্বর দেওয়া হয় ভবন নির্মাণের কার্যাদেশ। তবে কাজ শুরু হয় ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষে কাজটি তদারকি করছে জয়েন্টভেঞ্চার পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ডিকন। যৌথ উদ্যোগে কাজটি বাস্তবায়ন করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এমবি-ইসি।
বান্দরবানের প্রধান পাহাড়ি নদী সাঙ্গুর তীর ঘেঁষে নির্মিত হচ্ছে ভবনটি। স্থানীয় কয়েক বাসিন্দার অভিযোগ, প্রকল্প এলাকায় যথাযথ মাটি পরীক্ষা এবং নির্মাণকালীন পর্যাপ্ত লোড টেস্টিং হয়েছে কি না, সে বিষয়ে ছিল না স্বচ্ছতা।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সাইট ইঞ্জিনিয়ার নোবেল চাকমা। তার দাবি, দরপত্র অনুযায়ী ১৫টি পয়েন্টে লোড টেস্ট করার কথা থাকলেও প্রকল্পের নকশা ও আকার বিবেচনায় ৫০টি পয়েন্টে করা হয়েছে পরীক্ষা।
সয়েল টেস্ট সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘এ বিষয়ে তার কাছে কোনো তথ্য নেই।’
নদীর তীরে এত বড় স্থাপনা নির্মাণের ঝুঁকি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তার জবাব, ‘নকশা প্রণয়ন করেছে সংশ্লিষ্ট ডিজাইন বিভাগ। সেই নকশা অনুসারেই করা হচ্ছে নির্মাণকাজ।’
প্রকল্প প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিপুল পরিমাণ জমি এখনো রয়েছে কৃষি উৎপাদনের আওতার বাইরে। এই অঞ্চলে ফলদ, বনজ ও অর্থকরী ফসলের মানসম্পন্ন চারা উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করতে টিস্যু কালচার প্রযুক্তির বিকল্প নেই। প্রস্তাবনা অনুযায়ী, বান্দরবানে স্থাপিত এই কেন্দ্র থেকে তিন পার্বত্য জেলা ছাড়াও চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজার অঞ্চলের কৃষকরা পাবেন সেবা।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের দাবি, এটি শুধু একটি টিস্যু কালচার ল্যাব নয়; একই ভবনে থাকবে হর্টিকালচার সেন্টারের কার্যালয়, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম এবং অন্যান্য কৃষিসেবা পরিচালনার ব্যবস্থাও।
বান্দরবান হর্টিকালচার সেন্টারের উপপরিচালক লিটন দেবনাথের ভাষ্য, প্রকল্পের নকশা ও দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে। নির্মাণ তদারকির দায়িত্ব পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের।
নির্মাণে কোনো অনিয়ম বা ত্রুটি হয়েছে কি না— জবাবে তিনি বললেন, ‘সেখানে সরাসরি সম্পৃক্ততা নেই আমার।’
তবে প্রকল্পটির প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে তিনি বললেন, ‘টিস্যু কালচার প্রযুক্তির মাধ্যমে অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ মানসম্পন্ন চারা উৎপাদন সম্ভব।’
তার মতে, প্রচলিত কলম পদ্ধতিতে চারা উৎপাদনে দীর্ঘ সময় লাগে এবং ব্যয়ও হয় বেশি। অন্যদিকে টিস্যু কালচার প্রযুক্তিতে কয়েক মাসের মধ্যেই উৎপাদন করা যায় বিপুলসংখ্যক চারা, যা বহন করে মাতৃগাছের বৈশিষ্ট্য।
তবে স্থানীয়রা বলছেন, অতীতে বাস্তবায়িত অনেক কৃষি প্রকল্প প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি। ফলে নতুন এ প্রকল্পের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঝুঁকি রয়েছে কি না, সে বিষয়ে সংশয় আছে।
স্থানীয়ভাবে পরিচালিত হিমাগার ও মাশরুম প্রকল্পের উদাহরণ টেনে অনেকে বলছেন, অবকাঠামো নির্মাণের পর সেগুলো টেকসইভাবে পরিচালনার পরিকল্পনা না থাকলে বড় বিনিয়োগও হয়ে যেতে পারে অকার্যকর।
তবে হিমাগার প্রকল্প ও টিস্যু কালচার প্রযুক্তিকে এক কাতারে দেখা ঠিক হবে না বলে মনে করেন হর্টিকালচার সেন্টারের উপপরিচালক লিটন দেবনাথ। তার মতে, টিস্যু কালচার একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কৃষি প্রযুক্তি এবং দেশের অন্যান্য স্থানে পাওয়া গেছে এর ইতিবাচক ফলও।
টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন প্রকল্পের আওতায় দেশের পাঁচটি স্থানে নির্মাণ করা হচ্ছে অবকাঠামো। প্রকল্প ব্যয়ের একটি অংশ ভবন নির্মাণে ব্যবহৃত হলেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ ব্যয় হবে যন্ত্রপাতি ক্রয়, দেশ-বিদেশে প্রশিক্ষণ এবং পরামর্শক সেবায়।
পার্বত্য চট্টগ্রামে গত কয়েক দশকে সরকারি ও আন্তর্জাতিক সহায়তায় কৃষি খাতে বাস্তবায়িত হয়েছে শত শত কোটি টাকার প্রকল্প। বিভিন্ন সময়ে ফল চাষ, বাঁশ ও বেত, তুলা, কমলা, মসলা, কফি, কাজুবাদামসহ নানা প্রকল্পে ব্যয় করা হয়েছে বড় অঙ্কের অর্থ। তবে এসব প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এবং বাস্তব ফল নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে স্থানীয়দের অনেকেই মনে করেন।




