তিন দশকেও চালু হয়নি রাজবাড়ী বাস টার্মিনাল
- বাস টার্মিনাল রেখে অডিটরিয়াম ও স্কুল নির্মাণের পরিকল্পনা
- শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা
- পৌরসভার বকেয়া ১ কোটি ৬১ লাখ টাকা
- দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় জরাজীর্ণ অবকাঠামো

তিন দশক পেরিয়ে গেলেও বন্ধ রয়েছে রাজবাড়ী কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল। ছবি: সংগৃহীত
বাস টার্মিনাল নির্মাণে খরচ হয়েছিল ১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। উদ্বোধনের পর কিছুদিন চালুও হয়েছিল। কিন্তু তারপর আবার বন্ধ হয়ে যায় এটি। এরপর তিন দশক পেরিয়ে গেলেও বন্ধ রয়েছে রাজবাড়ী কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল। এখন সেই স্থাপনার দরজা-জানালা ভাঙা, পলেস্তারা খসে পড়ছে, টয়লেট ব্যবহারের অনুপযোগী। অপেক্ষমাণ কক্ষে নেই চেয়ার। কয়েকটি কক্ষ ব্যবহৃত হচ্ছে যানবাহন মেরামতের কাজে। আর বাস থামছে শহরের বিভিন্ন সড়ক ও মহাসড়কে। অথচ টার্মিনাল ও সংলগ্ন মার্কেট থেকে নিয়মিত ভাড়া আদায় করছে পৌরসভা, জেলা পরিষদের পাওনা রয়েছে ১ কোটি ৬১ লাখ টাকা।
জেলা পরিষদ বলছে, ১৯৯২-৯৩ অর্থবছরে রাজবাড়ী শহরের শ্রীপুর এলাকায় ৪ একর ১৪ শতাংশ জমির ওপর নির্মাণ করা হয় কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালটি। নির্মাণে ব্যয় হয় ১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। ১৯৯৪ সালের ১৯ এপ্রিল তৎকালীন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী জাহানারা বেগম টার্মিনালটি উদ্বোধন করেন। ২০০০ সালে এটি রাজবাড়ী পৌরসভার কাছে হস্তান্তর করা হয়।
উদ্বোধনের পর কিছুদিন কার্যক্রম চললেও টার্মিনালটি কখনোই পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি। ২০০৭ সালে কিছুদিন চালু থাকার পর ২০০৯ সালে আবার বন্ধ হয়ে যায়। এরপর বিভিন্ন সময়ে চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা স্থায়ী হয়নি। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় এখন টার্মিনালের ভবন ও অবকাঠামো জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে।
টাকা পরিশোধে বাকি ১ কোটি ৬১ লাখ
টার্মিনাল নির্মাণের ব্যয় ধাপে ধাপে জেলা পরিষদকে পরিশোধ করার কথা ছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত পৌরসভা দিয়েছে মাত্র ১৩ লাখ টাকা। জেলা পরিষদের হিসাবে বকেয়া রয়েছে প্রায় ১ কোটি ৬১ লাখ টাকা। অন্যদিকে টার্মিনাল ও সংলগ্ন মার্কেট থেকে নিয়মিত ভাড়া আদায় করছে পৌরসভা। অর্থাৎ স্থাপনাটি বাস টার্মিনাল হিসেবে কার্যকর না হলেও এর জমি ও সংলগ্ন স্থাপনা থেকে আয় হচ্ছে। কিন্তু যে উদ্দেশ্যে সরকারি অর্থ ব্যয়ে টার্মিনালটি নির্মাণ করা হয়েছিল, তা বাস্তবায়িত হয়নি।
মহাসড়কেই বাসের স্টপেজ
বর্তমানে শহরের মুরগির ফার্ম, বড়পুল এবং জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের কার্যালয়ের সামনে মহাসড়ক থেকে বাসে যাত্রী ওঠানামা করানো হচ্ছে। বাস রাখার জন্য মুরগির ফার্ম এলাকায় পৌরসভার কাছ থেকে জায়গা বন্দোবস্ত নিয়েছে পরিবহন মালিক গ্রুপ। সেখানে প্রতিটি বাসের কাছ থেকে ৫০ টাকা করে পার্কিং ফি নেওয়া হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল খালেক বলেন, ‘মহাসড়কের ওপর বাস দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানো ঝুঁকিপূর্ণ। টার্মিনালটি চালু করা গেলে যানজট ও মানুষের ভোগান্তি কমবে।’
বাসচালক মজিবর রহমান বলেন, ‘শুধু টার্মিনাল খুলে দিলেই হবে না। সব বাস সেখানে রাখা এবং সেখান থেকেই যাত্রী ওঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। এখন রাতে বাস টার্মিনালে রাখা হলেও সকালে শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে গিয়ে যাত্রী তোলা হয়।’
কেন চালু হচ্ছে না
পরিবহন মালিকদের ভাষ্য, টার্মিনালটি শহরের মূল অংশ থেকে দূরে হওয়ায় সেখানে যাত্রী পাওয়া যায় না। এ কারণে সেখানে যেতে আগ্রহী নন বাসমালিকরা। তাদের মতে, টার্মিনাল চালুর আগে প্রবেশপথসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সংস্কার করতে হবে।
রাজবাড়ী সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক সুকুমার ভৌমিক বলেন, ‘টার্মিনাল চালুর আগে প্রবেশপথ ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সংস্কার দরকার। এ বিষয়ে মালিকপক্ষ বৈঠক করেছে। দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা চলছে।’
এদিকে দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় টার্মিনালের অবকাঠামো নষ্ট হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সন্ধ্যার পর সেখানে মাদকসেবীদের আনাগোনাও বাড়ে। ফলে যাত্রী পরিবহনের জন্য নির্মিত একটি জনসেবামূলক স্থাপনা এখন কার্যত অচল অবস্থায় পড়ে আছে।
নতুন পরিকল্পনা, পুরনো প্রশ্ন
রাজবাড়ী পৌরসভার প্রশাসকের দায়িত্বে থাকা স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক কল্যাণ চৌধুরী জানান, জেলা পরিষদের বকেয়া অর্থ ধাপে ধাপে পরিশোধ করা হচ্ছে। টার্মিনালটি আবার চালুর বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। শিগগিরই যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তবে টার্মিনাল চালুর পাশাপাশি এর জমির নতুন ব্যবহারের পরিকল্পনাও করা হচ্ছে। জেলা পরিষদের প্রশাসক আব্দুস সালাম মিয়া বলেন, ‘দীর্ঘদিন কার্যকরভাবে ব্যবহার না হওয়ায় এখন বাসের গ্যারেজ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে টার্মিনালটি। জমিটির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে একাংশে বাস টার্মিনাল এবং অন্য অংশে এক হাজার আসনের জেলা পরিষদ অডিটরিয়াম ও জেলা কালেক্টরেট স্কুল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।’ অডিটরিয়াম নির্মাণে স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে ১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
প্রশ্ন উঠছে, নতুন স্থাপনা নির্মাণের আগে পুরোনো টার্মিনালটির পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে কি না। কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি জনসেবামূলক স্থাপনা দীর্ঘদিন অকার্যকর পড়ে থাকায় ক্ষতি শুধু অবকাঠামোর নয়, বঞ্চিত হচ্ছেন যাত্রী ও নগরবাসী।






