স্বামী হারিয়েও থামেননি, জীবিকার লড়াইয়ে ঘুরে দাঁড়াচ্ছেন বাঘবিধবারা

মানসিক স্বাস্থ্য ও সুস্থতা বিষয়ক সেশনে ৪০ বাঘবিধবা। নিজেদের জীবনের অভিজ্ঞতা ও সংকট নিয়ে কথা বলেন তারা
স্বামীকে হারানোর পর সংসারের হাল ধরতে নদীতে জাল টেনে মাছ ধরতেন পারভীন খাতুন। কখনো মাছ মিলত, কখনো ফিরতে হতো খালি হাতে। সেই অনিশ্চিত আয়ের ওপরই চলত সংসার। স্বামী হারিয়ে একই রকম কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিলেন খাদিজা খাতুনও।
তবে সময়ের সঙ্গে তাদের জীবনে এসেছে কিছুটা পরিবর্তন। খাদিজা পেয়েছেন একটি টেইলারিংয়ের (দর্জির) দোকান, আর পারভীন পেয়েছেন চাল ও পোলট্রি ফিডের ব্যবসার সুযোগ। এখন দুজনই চেষ্টা করছেন নিজের পায়ে দাঁড়াতে।
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার বাঘবিধবা খাদিজা বিবি ও পারভীন আক্তারের মতো আরও অনেক নারী স্বামী হারানোর পর নানা প্রতিকূলতার মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন। স্বামীর মৃত্যুর শোকের সঙ্গে তাদের লড়তে হয় সংসারের অভাব, সন্তানের ভবিষ্যৎ ও জীবিকার অনিশ্চয়তার সঙ্গে।
আজ শনিবার এমন ৪০ জন বাঘবিধবাকে নিয়ে আয়োজন করা হয় মানসিক স্বাস্থ্য ও সুস্থতা বিষয়ক বিশেষ সেশন। সেখানে নিজেদের জীবনের কষ্ট, সংকট ও ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প তুলে ধরেন তারা।
শনিবার বিকেলে সুন্দরবনসংলগ্ন বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নে পশ্চিম বন বিভাগের সাতক্ষীরা রেঞ্জের সিএমসি কার্যালয়ে ‘মন সুস্থ থাক, জীবন এগিয়ে যাক ৩.০’ শীর্ষক এ সেশন অনুষ্ঠিত হয়। জেসিআই ঢাকা সাউথের উদ্যোগে এবং ইনিশিয়েটিভ ফর কোস্টাল ডেভেলপমেন্ট (আইসিডি)-এর আয়োজনে অনুষ্ঠানটি হয়।
অনুষ্ঠানে স্বামী হারানোর পরের দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে খাদিজা খাতুন বলেছেন, ‘স্বামীকে হারানোর পর অনেক কষ্টের মধ্যে দিন কাটাতে হয়েছে। আজ আমাদের কথা শোনা হচ্ছে, মানসিকভাবে সাহস দেওয়া হচ্ছে এবং কাজের সুযোগ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এতে আমরা নতুন করে বাঁচার সাহস পাচ্ছি।
খাদিজা জানিয়েছেন, জেসিআইয়ের পক্ষ থেকে তাকে একটি টেইলারিংয়ের দোকান করে দেওয়া হয়েছে। এখন সেখান থেকে আয় করে সংসার চালানোর চেষ্টা করছেন তিনি। তার কাছে দোকানটি শুধু একটি কর্মসংস্থানের সুযোগ নয়, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর একটি পথও।
অন্যদিকে পারভীনের জীবনেও এসেছে পরিবর্তন। স্বামীকে হারানোর পর সংসারের খরচ জোগাতে তাকে নদীতে নামতে হয়েছে। জাল টেনে মাছ ধরে যা আয় হতো, তা দিয়েই কোনো রকমে চলত সংসার। নদীর ওপর নির্ভরশীল সেই অনিশ্চিত জীবন থেকে এখন বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছেন তিনি।
পারভীন খাতুন বলেছেন, আগে নদীতে জাল টেনে মাছ ধরে কষ্ট করে সংসার চালাতাম। জেসিআই থেকে চাল ও পোলট্রি ফিড দেওয়ায় আমি এখন স্বাবলম্বী।
আয়োজকদের ভাষ্য, বাঘবিধবাদের জীবনে শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, মানসিক শক্তি ফিরিয়ে আনাও জরুরি। স্বামী হারানোর শোক, জীবিকার অনিশ্চয়তা, সামাজিক চাপ ও দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে। তাই তাদের কথা শোনা, নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়া এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।
সেশনে অংশ নেওয়া ৪০ বাঘবিধবা নিজেদের জীবনের নানা সংকট ও অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনা করেন। তাদের মানসিক সুস্থতা, আত্মবিশ্বাস ও পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি টেকসই কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
জেসিআই ঢাকা সাউথের প্রেসিডেন্ট লোকাল নাইম হায়দার বলেছেন, ‘মানসিক সুস্থতা আমাদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই বাঘবিধবাদের মানসিক শক্তি ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধির পাশাপাশি তাদের টেকসই কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতেও আমরা কাজ করছি। তারা যাতে স্বাবলম্বী হয়ে সম্মানের সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারেন, সেটিই আমাদের লক্ষ্য।
জেসিআই বাংলাদেশের ন্যাশনাল ডিরেক্টর ও পাস্ট লোকাল প্রেসিডেন্ট কাজী মোতায়াজ্জেদ বিল্লাহ বলেছেন, ‘বাঘবিধবাদের জীবনে স্বস্তি ও স্বাবলম্বিতা ফিরিয়ে আনতে মানসিক সুস্থতার পাশাপাশি টেকসই কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা জরুরি। সমন্বিত এই উদ্যোগ তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়াবে এবং পরিবারকে আরও নিরাপদ ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে নেবে।
আইসিডির সভাপতি আশিকুজ্জামান বলেন, ‘বাঘবিধবাদের মানসিক সুস্থতার পাশাপাশি টেকসই কর্মসংস্থানের মাধ্যমে তাদের স্বাবলম্বী করে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।
অনুষ্ঠানে জেসিআই ঢাকা সাউথের চেয়ারপারসন সাখাওয়াত হোসেন, জেসিআই জিআইবি বিজনেসের তৌসিফ মুস্তাসিন রাফিন, সিনেটর আতিকুর রহমান সম্রাট, নূর ইয়াশ শামস, উপকূলীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি আব্দুল হালিম, সাংবাদিক পিযুষ বাউয়ালিয়া পিন্টু, আইসিডির সদস্য হাফিজুর রহমান, আশিকুর রহমান, ইমাম হোসেন ও মুনতাকিমুল ইসলাম রুহানিসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।






