সিলেট
কিছু উদ্যোগ শেষ করা গেল না : ডিসি সারওয়ার

শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারে সিলেটের সদ্য প্রত্যাহার হওয়া ডিসি সারওয়ার আলম। ছবি: আগামীর সময়
‘সরকারি চাকরিতে বদলি একটি স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। সরকার যেখানেই দায়িত্ব দেবে, সেখানেই কাজ করতে হবে। তবে সিলেটে দায়িত্ব পালনকালে নেওয়া কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ বদলির কারণে শেষ করা সম্ভব হয়নি।’ কথাগুলো সিলেটের সদ্য প্রত্যাহার হওয়া জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলমের।
যে মাজারকাণ্ডে তাকে প্রত্যাহারের গুঞ্জণ, বিদায়ের আগে সেই শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারে গেছেন তিনি। আজ দুপুর ১টার দিকে সেখানে কথা বলেন সাংবাদিকদের সঙ্গে।
নানা প্রশ্নে সারওয়ারের জবাব, ‘দায়িত্ব পালনকালে জনস্বার্থে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। আমি সবসময় সরকারি বিধি-বিধান ও প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেছি। মাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে যে পদক্ষেপগুলো নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সুশাসন নিশ্চিত করা। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।’
‘তবে পরিবর্তন বা সংস্কারমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করলে বিভিন্ন ধরনের মতামত ও প্রতিক্রিয়া আসতেই পারে। আমি মনে করি, জনস্বার্থ ও নিয়মের মধ্যে থেকে যে কাজগুলো করা হয়েছে, সেগুলোর চূড়ান্ত মূল্যায়ন করবেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং সাধারণ মানুষ’- মনে করেন সারওয়ার আলম।
তাকে প্রত্যাহারের আদেশ বাতিলের দাবিতে এর আগে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর দরগাহ প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন হয়। সর্বস্তরের জনতার ব্যানারে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে যোগ দেন আলেম-ওলামাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
তাদের অভিযোগ, শহরের ফুটপাত দখলমুক্তকরণ, অবৈধ দখল ও অনিয়মের বিরুদ্ধে অভিযান এবং হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজারের আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিতে উদ্যোগ নেওয়ায় একটি স্বার্থান্বেষী মহল সারওয়ারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।
অবিলম্বে ডিসি সারওয়ার আলমের প্রত্যাহারের আদেশ বাতিল না হলে বৃহত্তর আন্দোলন, গণসমাবেশ ও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করার কথাও জানালেন বক্তারা।
যা ঘটেছে ‘মাজারকাণ্ডে’
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে গতকাল রবিবার সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার করে সংযুক্ত করা হয় মন্ত্রণালয়ে উপসচিব হিসেবে। গত বছরের আগস্টে পাথরকাণ্ডের পর সিলেটের জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন তিনি।
এই ১০ মাসে প্রশাসনিক বিতর্কে না জড়ালেও সম্প্রতি শাহজালাল (রহ.) ও শাহপরান (রহ.) মাজারের দান ব্যবস্থাপনা সংস্কার করতে গিয়ে কোথাও আলোচিত কোথাও সমালোচিত হন তিনি।
সিলেটের দুটি ঐতিহাসিক মাজারে প্রতিদিন হাজারো ভক্ত ও দর্শনার্থী আসেন। দান করেন নগদ অর্থ, স্বর্ণালঙ্কার, গবাদিপশু এবং বিভিন্ন সামগ্রী। দীর্ঘদিন ধরে দানের হিসাব, ব্যয় ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্থানীয়ভাবে প্রশ্ন উঠলেও বিষয়টি কখনো কার্যকর প্রশাসনিক নজরদারির আওতায় আসেনি।
প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, এই দান ব্যবস্থাপনা সংস্কারে বিএনপির সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম সাইফুর রহমান একবার উদ্যোগ নিলেও পরে তা ভেস্তে যায়। এবার সেই উদ্যোগ নেওয়ার পর পদই খোয়ালেন ডিসি সারওয়ার।
গত ১২ জুন শাহজালাল (রহ.) মাজার পরিদর্শনে যান সদ্য প্রত্যাহার হওয়া এই ডিসি। দান ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তিনি। বলেছিলেন, মাজারের আয় কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নয়, তা ধর্মীয় ও জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় নিশ্চিত করাই প্রশাসনের লক্ষ্য। মাজারকেন্দ্রিক সেবা উন্নয়ন, নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং একটি দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
এর কয়েকদিন পর মাজারে মানতের টাকা সংগ্রহের জন্য ব্যবহৃত তিনটি ডেগ সিলগালা করে জেলা প্রশাসন। স্থাপন করা হয় নতুন দানবাক্স। ওই অভিযানে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল বাছিত মোল্লা জানিয়েছিলেন, এখন থেকে ভক্তদের দেওয়া সব ধরনের দান প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে থাকা দানবাক্সে জমা হবে। দানবাক্সগুলোর নিরাপত্তায় মোতায়েন করা হয় আনসার সদস্যও।
তবে প্রশাসনের এই উদ্যোগের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নেয় মাজারের খাদেমদের একটি পক্ষ। দান ব্যবস্থাপনায় প্রশাসনের হস্তক্ষেপের সমালোচনা করে প্রচলিত ব্যবস্থার পক্ষে বক্তব্য দেন তারা।
মাজারের খাদেম পরিবারের সদস্য মুফতি রায়হান উদ্দিন মুন্না এই উদ্যোগকে বর্তমান সরকার ও বিএনপি পরিবারকে বিতর্কিত করার একটি ‘সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র’ বলে দাবি করেন। তিনি জানালেন, জেলা প্রশাসককে কেউ ভুল বুঝিয়ে তাদের পেছনে লেলিয়ে দিয়েছে। মাজারের ভক্তরা তা হতে দেবে না।
এই বিরোধিতার মধ্যেই ডিসি সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার করা হলো। প্রজ্ঞাপনে প্রত্যাহারের কারণ উল্লেখ না করা হলেও এর পেছনে মাজারকাণ্ড বলেই পোক্ত ধারণা সংশ্লিষ্টদের।
জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের নাম প্রকাশে অনাগ্রহী এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বললেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিছু জনস্বার্থমূলক ও সংস্কারধর্মী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, যা স্থানীয়ভাবে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছিল। বিশেষ করে নগর ব্যবস্থাপনা, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং মাজার ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা নিশ্চিতের মতো কাজগুলো শুরু করা হয়েছিল।’
‘তবে এ ধরনের উদ্যোগ অনেক সময় স্থানীয়ভাবে সংবেদনশীল হয়ে ওঠে এবং নানা পক্ষের প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। এখানে ব্যক্তিগত বিষয় নয়, বরং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াই মুখ্য। বদলি বা পদায়নের সিদ্ধান্ত সাধারণত সরকারের নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই হয়ে থাকে। তবে প্রশাসনিক পরিবর্তন এসব কাজের ধারাবাহিকতাকে প্রভাবিত করতে পারে’- মনে করেন এই কর্মকর্তা।




