আসলেন পাথরকাণ্ডে, গেলেন মাজার বিতর্কে

সংগৃহীত ছবি
সিলেটের প্রশাসনিক ইতিহাসে কিছু বদলি থাকে কেবল রুটিন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, আবার কিছু বদলি সময়ের ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে মিলিয়ে চলে আসে আলোচনার কেন্দ্রে। জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমের সাম্প্রতিক প্রত্যাহার স্থান পেয়েছে দ্বিতীয় তালিকাতেই।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সিলেটের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার করে সংযুক্ত করা হয়েছে মন্ত্রণালয়ে উপসচিব হিসেবে। প্রজ্ঞাপনে বদলির কারণ উল্লেখ করা হয়নি। তবে সাম্প্রতিক কয়েকটি আলোচিত ঘটনার প্রেক্ষাপটে তার এই প্রত্যাহার সিলেটবাসীর মনে জন্ম দিয়েছে অনেক প্রশ্নের।
সিলেটে দায়িত্ব গ্রহণের পর শুরুতে অবৈধ পাথর উত্তোলন, পরিবেশবিধি লঙ্ঘন এবং প্রভাবশালী মহলের নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের কারণে আলোচনায় আসেন তিনি। বিষয়টি ‘পাথরকাণ্ড’ নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকা হিসেবে পরিচিতি পায় স্থানীয়ভাবে। অভিযান, নজরদারি ও প্রশাসনিক তৎপরতার কারণে জনপরিসরে তার কার্যক্রম আলোচিত হয় বিশেষভাবে।
সম্প্রতি আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে সারওয়ার আলম। এবার সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.) ও শাহপরান (রহ.) মাজারের দান ব্যবস্থাপনা নিয়ে। মানতের টাকা সংগ্রহের প্রচলিত পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনে দানবাক্স স্থাপন এবং কিছু কাঠামোগত পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে প্রশাসন। এসব উদ্যোগকে দানের অর্থের স্বচ্ছতা ও জনআস্থা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করলেও, সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে রয়েছে চরম অসন্তোষ। অনেকের মতে, দীর্ঘদিনের প্রচলিত ব্যবস্থার সঙ্গে এসব পদক্ষেপ তৈরি করছিল সংঘাত। আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই আসে জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত।
সরকারি পর্যায়ে এটিকে নিয়মিত প্রশাসনিক রদবদল হিসেবে ব্যাখ্যা করা হলেও প্রশ্ন উঠেছে জনমনে। একাধিক সংবেদনশীল বিষয়ে দৃশ্যমান ভূমিকা পালনকারী একজন কর্মকর্তার এই বদলি কি কেবল নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ, নাকি এর রয়েছে অন্য কোনো যোগসূত্র?
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মো. সারওয়ার আলমের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন ধরেননি তিনি।
অন্যদিকে হযরত শাহজালাল (রহ.) দরগাহ শরীফের সরেকওম মোতাওয়াল্লী ফতেহ উল্লাহ আল আমান বলছেন, ‘জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমের বদলি সরকারের প্রশাসনিক বিষয়। তবে তার দায়িত্ব পালনকালে দরগাহ শরীফের দান ও মানত ব্যবস্থাপনা নিয়ে যে আলোচনা ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল, তা সাধারণ ভক্ত-আশেকান এবং সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহের জন্ম দিয়েছে। আমরা সবসময় মনে করি, দরগাহ শরীফের শতবর্ষের ঐতিহ্য, ধর্মীয় অনুভূতি এবং প্রচলিত ব্যবস্থাপনার প্রতি সম্মান রেখে যেকোনো সংস্কার বা পরিবর্তন আনা উচিত। একই সঙ্গে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাও নিশ্চিত করতে হবে। ভবিষ্যতে এ ধরনের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামতের ভিত্তিতে সমন্বিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে আমরা আশা করি।’
যদিও প্রশাসনসংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষকদের মতে, সরকারি প্রশাসনে বদলি একটি চলমান প্রক্রিয়া। তবে কোনো কর্মকর্তা যখন একাধিক স্পর্শকাতর বিষয়ে একসঙ্গে দৃশ্যমান থাকেন, তখন তার প্রস্থানও স্বাভাবিকের বাইরে গিয়ে জন্ম দেয় আলোচনার।
সিলেটে এখন সমানভাবে উচ্চারিত হচ্ছে দুটি বিষয়, ‘পাথরকাণ্ড’ ও ‘মাজার বিতর্ক’। একটির কেন্দ্র ছিল পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ন্ত্রণ, অন্যটির কেন্দ্র ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও দান ব্যবস্থাপনা। এই দুই ভিন্ন বাস্তবতার মধ্যেই এসেছে একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমের বদলি।




