রায়পুরের মা-তিন মেয়ে খুন, পুরনো বিরোধই কি হত্যার নেপথ্যে?

ছবি: আগামীর সময়
লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। হামলার পর ক্ষুব্ধ জনতার পিটুনিতে নিহত হয়েছেন অভিযুক্ত যুবকও।
এখনো হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। তবে তদন্তে উঠে এসেছে পুরোনো বিরোধের সূত্র।
স্থানীয়দের দাবি, কয়েক মাস আগে শাহিনুর বেগমকে উত্ত্যক্ত করার ঘটনায় বাসা ছাড়তে বাধ্য হন ওই যুবক। সেই ক্ষোভ থেকেই প্রতিশোধ নিতে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে থাকতে পারেন অভিযুক্ত।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে এ ঘটনা ঘটে রায়পুর পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের গোডাউন রোডের দেনায়েতপুর এলাকার একটি ভাড়া বাসায়।
হামলার পর স্থানীয় জনতার গণপিটুনিতে অভিযুক্ত অন্তর মজুমদার (৩০) গুরুতর আহত হন। পরে ঢাকায় নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।
নিহতরা হলেন শাহিনুর বেগম (৩৮), তার বড় মেয়ে সায়মা আক্তার (২০), মেজো মেয়ে নাফিজা আক্তার ইকরা (১৬) এবং ছোট মেয়ে শিফা আক্তার (৯)।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শাহিনুর বেগমের বাড়ি কুমিল্লা জেলায়। তিনি দীর্ঘদিন ধরে তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে রায়পুরের ওই বাসায় ভাড়া থাকতেন। তার স্বামী মো. কামাল হোসেন মারা যান ২০১৯ সালে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে। এরপর থেকেই সংসারের দায়িত্ব একাই পালন করছিলেন শাহিনুর।
বড় মেয়ে সায়মা আক্তার আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেছেন। নাফিজা আক্তার ইকরা রায়পুর সরকারি মার্চেন্টস একাডেমি থেকে এসএসসি পরীক্ষার ফলপ্রত্যাশী ছিলেন। ছোট মেয়ে শিফা একই বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী। একমাত্র ছেলে জুনায়েদ ইসলাম রায়পুর সরকারি কলেজে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করেন একটি দোকানে।
প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, অন্তর মজুমদারের বাড়ি নোয়াখালীর সুবর্ণচরে। তিনি ভ্যানে করে ফল বিক্রি করতেন। প্রায় এক বছর আগে একই ভবনের পাঁচতলার একটি কক্ষে ভাড়া থাকতেন। সেই সময় শাহিনুর বেগমের পরিবারের সঙ্গে তার পরিচয় হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভবনের দুই নারী ভাড়াটিয়া জানিয়েছেন, পরিচয়ের পর থেকে অন্তর প্রায়ই শাহিনুরকে উত্ত্যক্ত করতেন এবং অশোভন মন্তব্য করতেন। তার বিরুদ্ধে মাদক সেবনের অভিযোগও রয়েছে। কয়েক মাস আগে এ নিয়ে শাহিনুরের সঙ্গে তার বাগবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে বিষয়টি বাড়ির মালিককে জানানো হলে অন্তরকে বাসা ছেড়ে দিতে বলা হয়। পরে তিনি বাসা ছাড়লেও ওই ঘটনার ক্ষোভ থেকেই প্রতিশোধ নিতে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে থাকতে পারেন বলে তাদের ধারণা।
আরেক প্রতিবেশীর ভাষ্য, বৃহস্পতিবার সকাল ৯টার পর শাহিনুরের বাসায় যান অন্তর। সেখানে তাদের মধ্যে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে শাহিনুর ও তার তিন মেয়েকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করেন তিনি। শাহিনুরের চিৎকার শুনে অন্তরকে আটক করে এবং গণপিটুনি দেয় স্থানীয়রা। পরে মৃত্যু হয় তার।
ঘটনার পর উত্তেজিত জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে ইটপাটকেলের আঘাতে আহত হন পুলিশের ছয় সদস্য।
পাশের বাসার ভাড়াটিয়া রোকেয়া বেগমের ভাষ্য, সকালে বাসার ভেতর থেকে চিৎকার শুনে জানালা দিয়ে তাকিয়ে তিনি দেখেন, শাহিনুর ও তার মেয়েদের কুপিয়ে পালানোর চেষ্টা করছেন অন্তর। পরে তাকে ধরে ফেলেন স্থানীয়রা।
লক্ষ্মীপুরের সহকারী পুলিশ সুপার (রায়পুর সার্কেল) মো. আব্দুর রাশেদ জানিয়েছেন, হত্যার উদ্দেশ্য এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। অভিযুক্তও মারা যাওয়ায় আরও জটিল হয়েছে তদন্ত। তবে স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রতিবেশীদের কাছ থেকে পুলিশ জানতে পেরেছে, অন্তর আগে একই ভবনে ভাড়া থাকতেন এবং শাহিনুরকে উত্ত্যক্ত করতেন।
তিনি আরও জানান, শাহিনুরের অভিযোগের পর বাসা ছাড়তে হয় তাকে। সেই ঘটনার জের ধরে প্রতিশোধ নিতে হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এসব তথ্য যাচাই করে দেখা হচ্ছে এবং তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।





