মিয়ানমারে ঠাঁই পেতে অস্ত্র হাতে নেওয়ার হুঁশিয়ারি রোহিঙ্গা নেতার

‘রোহিঙ্গা গণহত্যা দিবসে’ টেকনাফের শালবাগান ক্যাম্পের মাঠে সমাবেশে বক্তব্য দিচ্ছেন রোহিঙ্গা নেতা আবু তাহের।
৯ বছর ধরে শরণার্থী জীবন। নিজ দেশে ফেরার অপেক্ষায় কেটে গেছে একের পর এক বছর। প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ হয়েছে, আলোচনা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে ফেরার পথ খোলেনি। দীর্ঘ এই অনিশ্চয়তা ও হতাশার মধ্যেই এবার অস্ত্র হাতে নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন রোহিঙ্গা নেতা আবু তাহের।
তিনি বলেছেন, ‘আলোচনার মাধ্যমে মিয়ানমারে ফেরা সম্ভব না হলে রোহিঙ্গা তরুণ-যুবকেরা অস্ত্র হাতে নিজেদের ভূমি ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করবেন।’
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) ‘রোহিঙ্গা গণহত্যা দিবস’ উপলক্ষে টেকনাফের শালবাগান ক্যাম্পের মাঠে আয়োজিত সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে এমন হুঁশিয়ারি দেন আবু তাহের।
ইউসিআর আয়োজিত এ সমাবেশে নারী ও শিশুসহ বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা অংশ নেন। নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের দাবিতে তারা বিভিন্ন স্লোগান দেন।
সমাবেশে আবু তাহের বললেন, ‘৯ বছর ধরে শরণার্থী জীবন কাটাচ্ছি। অথচ নিজ দেশে ফেরার কার্যকর কোনো পথ এখনো তৈরি হয়নি। আমরা আলোচনার মাধ্যমে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের সমাধান চাই।’
এরপরই কঠোর ভাষায় নিজের অবস্থান তুলে ধরে আবু তাহের বলেছেন, ‘রোহিঙ্গা জাতি অস্ত্র চালাতে জানে, গুলি করতে জানে। আলোচনার মাধ্যমে ফেরত যাওয়া সম্ভব না হলে রোহিঙ্গা তরুণ-যুবকেরা অস্ত্র হাতে নিজেদের জায়গা ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবে। এটি আমাদের শেষ পরিকল্পনা।’
আবু তাহেরের এই বক্তব্যকে ঘিরে ক্যাম্পগুলোতে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিনের প্রত্যাবাসন-হতাশা ও ক্ষোভ থেকেই এমন বক্তব্য এসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, এটি কোনো সাধারণ রোহিঙ্গার বক্তব্য নয়, গণহত্যা দিবসের সমাবেশে দেওয়া একজন রোহিঙ্গা নেতার প্রকাশ্য হুঁশিয়ারি।
রোহিঙ্গাবিষয়ক গবেষক আলতাফ পারভেজ জানালেন, দীর্ঘ ৯ বছরেও প্রত্যাবাসন না হওয়ায় রোহিঙ্গাদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা তীব্র হয়েছে। নিজেদের জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়া তাদের অধিকার। তবে কোনো ধরনের সশস্ত্র তৎপরতা বাংলাদেশের ভূখণ্ড বা সীমান্ত ব্যবহার করে চালানো উচিত নয়।
তার ভাষ্য, বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে রোহিঙ্গারা সশস্ত্র যুদ্ধের ঘোষণা দিতে পারেন না। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তাদের সতর্ক করা প্রয়োজন। রোহিঙ্গারা অস্ত্র হাতে সংঘাতে জড়ালে এবং সেই সংঘাতের জন্য বাংলাদেশের সীমান্ত বা ভূখণ্ড ব্যবহৃত হলে এর সরাসরি প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের ওপর। এতে সীমান্ত নিরাপত্তার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাতেও বড় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
সমাবেশে রোহিঙ্গা নেতা বদরুল ইসলাম বলেছেন, ‘২৫ আগস্ট তাদের জন্য কোনো আনন্দের দিন নয়, এটি গণহত্যা ও নির্যাতনের স্মরণে শোকের দিন। তারা ওই হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং নাগরিক অধিকার ফিরে পাওয়ার দাবি জানান। নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে নিজেদের জন্মভূমিতে ফিরে যেতে চান বলেও জানান তিনি।
কলেজের মাঠ যেন জলাধার
২৫ আগস্ট ২০২৬
টেকনাফের লেদা ক্যাম্পের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলম বললেন, ‘আমরা এ দেশের অতিথি। কিন্তু দীর্ঘদিন হয়ে গেছে। এখন আমরা আমাদের জন্মভূমি মিয়ানমারে ফিরে যেতে চাই।’
নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের জন্য বিশ্ববাসীর সহযোগিতা চেয়ে তিনি আরও বললেন, ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দীর্ঘসূত্রতায় আমরা আর অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে চাই না।’
উখিয়ার রোহিঙ্গা নেতা মোহাম্মদ জোবায়ের বলেছেন, ‘৯ বছরের শরণার্থী জীবন থেকে মুক্তি চাই। নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করে নিজ দেশে ফিরতে চাই। প্রত্যাবাসন যত বিলম্বিত হবে, বাংলাদেশ সরকারের ওপর তত বেশি চাপ ও ক্ষতি বাড়বে। দীর্ঘ অনিশ্চয়তা হতাশা ও উত্তেজনা তৈরি করলেও কোনো ধরনের উসকানিতে পা না দিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে নিজ দেশে ফিরতে চাই।’
এদিকে টেকনাফ ১৬-আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের অতিরিক্ত ডিআইজি মুহাম্মদ কাউছার সিকদার বলেছেন, ‘আমাদের আওতাধীন ক্যাম্পে রোহিঙ্গারা শান্তিপূর্ণভাবে গণহত্যা দিবসের কর্মসূচি পালন করেছেন। তারা শরণার্থী জীবন থেকে মুক্তি, নাগরিক অধিকার ফিরে পাওয়া এবং নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের দাবি জানিয়েছেন। কর্মসূচিকে ঘিরে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। ক্যাম্পগুলোর পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও শান্তিপূর্ণ রয়েছে।’
কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্যসচিব এইচ এম নজরুল ইসলামের মতে, ৯ বছর আগে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন এখনো অনিশ্চিত। সেই অনিশ্চয়তার মধ্যেই আবু তাহেরের অস্ত্র হাতে নেওয়ার হুঁশিয়ারি নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। প্রত্যাবাসনের পথ যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই ক্যাম্পের হতাশা কঠোর ভাষায় প্রকাশ পাচ্ছে। গণহত্যা দিবসের সমাবেশে দেওয়া এই বক্তব্য তারই উদাহরণ।









