আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পোল্ট্রি খামারে সফল শফিকুল ইসলাম

ছবি: কুমিল্লার তিতাস উপজেলার গোমতী এগ্রো কেয়ার পোল্ট্রি ফার্ম।
পোল্ট্রি খামার এখন আর আগের মতো প্রচলিত পদ্ধতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি পরিণত হয়েছে প্রযুক্তিনির্ভর ও পরিবেশবান্ধব শিল্পে। অটোমেটেড ফিডিং ও ড্রিংকিং সিস্টেম, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে প্যাড-কুলিং ব্যবস্থা এবং কঠোর জৈবনিরাপত্তার সমন্বয়ে দেশের নিরাপদ মাংস ও ডিম উৎপাদনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলছে আধুনিক পোল্ট্রি শিল্প।
এমনই একটি আধুনিক পোল্ট্রি খামার গড়ে তুলে সফল হয়েছেন কুমিল্লার তিতাস উপজেলার কলাকান্দি ইউনিয়নের কলাকান্দি গ্রামের বাসিন্দা এবং গোমতী এগ্রো কেয়ার পোল্ট্রি ফার্মের পরিচালক ও উদ্যোক্তা মো. শফিকুল ইসলাম।
সোমবার সরেজমিনে খামারটি ঘুরে দেখা যায়, এটি যেন চীন, জাপান কিংবা ইউরোপের কোনো আধুনিক পোল্ট্রি প্রকল্পের প্রতিচ্ছবি। আগামীর খাদ্যনিরাপত্তা, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা ও জৈবনিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে গোমতী এগ্রো কেয়ার পোল্ট্রি ফার্ম। শুধু অর্থ নয়, এ খামারে শফিকুল ইসলাম বিনিয়োগ করেছেন নিজের মেধা, স্বপ্ন ও সাহসও।
খামারের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত ঘুরে দেখানোর সময় শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘জৈবনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘ডেনসিটি অব বার্ডস’ অনুসরণ করা খুবই জরুরি। আমরা সেটিই অনুসরণ করছি।’
বিশাল এই খামারে রয়েছে বড় আকারের তিনটি শেড। প্রতিটি শেডে রয়েছে ১৫ হাজার করে মুরগি। সব মিলিয়ে বর্তমানে খামারে রয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার মুরগি। পুরো ব্যবস্থাপনাই স্বয়ংক্রিয়। মুরগিকে খাদ্য সরবরাহ থেকে শুরু করে পানি দেওয়া পর্যন্ত সবকিছুই প্রযুক্তিনির্ভর যান্ত্রিক ব্যবস্থায় পরিচালিত হচ্ছে।
২০২৩ সালে পোল্ট্রি ব্যবসায় যুক্ত হন শফিকুল ইসলাম। এর আগে দেশের প্রায় ৩০টি প্রথম শ্রেণির আধুনিক পোল্ট্রি খামার পরিদর্শন করে ধারণা নেন তিনি। পরে চীনে তিন মাসের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। দেশে ফিরে আট একর জমির ওপর সাড়ে চার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করেন তিনটি আধুনিক শেড। এসব শেডে মোট ৫০ হাজার মুরগি পালনের সক্ষমতা রয়েছে।
বর্তমানে তিনটি শেডে ৪৫ হাজার মুরগি রয়েছে। প্রতি ৩৫ দিন পরপর মুরগি বিক্রি করা হয়। প্রতিটি মুরগির ওজন হয় প্রায় দুই কেজি। খামারটিতে বর্তমানে ২০ জন কর্মচারী কাজ করছেন।
গোমতী এগ্রো কেয়ার পোল্ট্রি ফার্মের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো সম্পূর্ণ আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা। এখানে হাতে খাবার বা পানি দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। আধুনিক ‘অটো ফিডার’ ও ‘নিপেল ড্রিংকার’-এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ে ও নির্ধারিত পরিমাণে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হয়।
তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণেও রয়েছে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার। গ্রীষ্মের তীব্র গরমে মুরগির মৃত্যুহার কমাতে ব্যবহার করা হয়েছে ‘প্যাড-কুলিং’ ও ‘এক্সজস্ট ফ্যান’ সিস্টেম। ফলে বছরের যেকোনো সময় খামারের ভেতরের পরিবেশ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হচ্ছে।
জৈবনিরাপত্তার ক্ষেত্রেও রয়েছে কঠোর ব্যবস্থা। বাইরের জীবাণু প্রবেশ ঠেকাতে খামারে স্থাপন করা হয়েছে জীবাণুমুক্ত ফটক ও ফুটবাথ ব্যবস্থা। দর্শনার্থীদের প্রবেশও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত।
এছাড়া খামারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে ঘিরেও রয়েছে বড় পরিকল্পনা। মুরগির বিষ্ঠা ব্যবহার করে জৈব সার ও বায়োগ্যাস উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে এই বর্জ্য থেকেই বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনাও রয়েছে, যা খামারের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আশপাশের কয়েকশ পরিবারকে বায়োগ্যাস সুবিধা দিতে সক্ষম হবে।
উদ্যোক্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা অত্যন্ত অর্গানিক পদ্ধতিতে মুরগি পালন করি। শতভাগ সুস্থ মুরগির স্বাদই আলাদা।’
তিনি আরও বলেন, ‘জৈবনিরাপত্তার স্বার্থে খামারের কর্মীদের জন্য ২৪ ঘণ্টার আবাসিক ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার দিকেও বিশেষ নজর দেওয়া হয়।’
তিনি জানান, ভবিষ্যতে খামারেই মুরগির খাদ্য উৎপাদনের পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের।
শুধু একটি পোল্ট্রি খামার নয়, বরং আধুনিক ও টেকসই খাদ্য উৎপাদনের একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্প কাঠামো হিসেবে গড়ে উঠছে গোমতী এগ্রো কেয়ার পোল্ট্রি ফার্ম। উদ্যোক্তা শফিকুল ইসলামের এই উদ্যোগকে অনেকেই আগামীর খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তার একটি সম্ভাবনাময় মডেল হিসেবে দেখছেন।






