৬০০ বছরের ঐতিহ্যের নীরব সাক্ষী ‘গায়েবি মসজিদ’

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের ‘গায়েবি মসজিদ’— আগামীর সময়
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে বিলাস ছড়ার তীরঘেঁষে সবুজ প্রকৃতির মাঝে দাঁড়িয়ে আছে তিন গম্বুজবিশিষ্ট একটি প্রাচীন মসজিদ। স্থানীয়দের কাছে এটি ‘গায়েবি মসজিদ’ নামে পরিচিত। প্রায় ছয় শতাব্দীর ইতিহাস, ধর্মীয় বিশ্বাস, লোককথা ও গ্রামীণ ঐতিহ্যের অনন্য মেলবন্ধন হিসেবে মসজিদটি দীর্ঘদিন ধরে দর্শনার্থী, গবেষক ও ধর্মপ্রাণ মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। তবে মসজিদে যাতায়াতের একমাত্র ভরসা বাঁশের সাঁকো হওয়ায় স্থায়ী সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
সরেজমিনে দেখা যায়, আশিদ্রোন ইউনিয়নের জিলাদপুর গ্রামের বিস্তীর্ণ ফসলি মাঠ, গাছপালা ও নিরিবিলি পরিবেশে ঘেরা মসজিদটি মোগল স্থাপত্যশৈলীর আদলে নির্মিত। এতে রয়েছে তিনটি গম্বুজ। নির্মাণে আধুনিক রড বা সিমেন্টের ব্যবহার চোখে পড়ে না। চুন-সুরকি ও প্রাচীন নির্মাণসামগ্রী দিয়ে নির্মিত স্থাপনাটি সময়ের নানা পরীক্ষার মধ্য দিয়েও তার ঐতিহ্যবাহী সৌন্দর্য ধরে রেখেছে। কয়েক দফা সংস্কার করা হলেও মূল কাঠামোর প্রাচীন বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ রয়েছে।
স্থানীয়দের মুখে মুখে প্রচলিত রয়েছে, প্রায় ছয়শ বছর আগে এক রাতের মধ্যেই রহস্যজনকভাবে মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল। অনেকের বিশ্বাস, মানুষের পক্ষে এত অল্প সময়ে এমন স্থাপনা নির্মাণ সম্ভব ছিল না। তাই জ্বিন বা অলৌকিক শক্তির মাধ্যমে এটি নির্মিত হয়েছিল বলে লোকবিশ্বাস গড়ে ওঠে। তবে এ বিশ্বাসের পক্ষে কোনো ঐতিহাসিক বা প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবুও দীর্ঘদিন ধরে এই কাহিনি স্থানীয় সংস্কৃতি ও লোকঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে।
প্রায় তিন একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত মসজিদটিতে বর্তমানে একসঙ্গে প্রায় দেড় শতাধিক মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। শুরুতে কোনো বারান্দা ছিল না। পরে স্থানীয়দের উদ্যোগে বারান্দা নির্মাণ, অজুখানা ও শৌচাগারের উন্নয়ন এবং দেয়ালে রঙের প্রলেপসহ বিভিন্ন সংস্কারকাজ করা হয়েছে। প্রতিদিন স্থানীয় মুসল্লিদের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত দর্শনার্থীরাও মসজিদটি দেখতে আসেন। অনেকেই ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে মানত করেন এবং দোয়া করতে এখানে উপস্থিত হন।
স্থানীয় মুরুব্বি সুবাহান আলী বলেছেন, ‘মসজিদটি ঠিক কত বছর আগে নির্মিত হয়েছে, তা নিশ্চিতভাবে কেউ বলতে পারেন না। আমাদের পূর্বপুরুষরাও এখানে নামাজ আদায় করেছেন। ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি, এটি গায়েবি মসজিদ। সেই বিশ্বাস আজও মানুষের মধ্যে রয়েছে।’
গায়েবি মসজিদের ইমাম হাফেজ আব্দুল আলিম বললেন, ‘আমরা এখানেই বসবাস করি। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্য মুসল্লিদের এই বাঁশের সাঁকো পার হয়ে আসতে হয়। বর্ষাকালে সাঁকো ভেঙে গেলে দুর্ভোগ চরমে পৌঁছে। অনেক সময় বৃষ্টির মধ্যে পানি পার হয়ে মসজিদে আসতে হয়। শিশু ও বয়স্কদের জন্য এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। প্রশাসনের কাছে আমাদের আবেদন, অস্থায়ী সাঁকোর পরিবর্তে সরকারি অর্থায়নে একটি স্থায়ী পাকা সেতু নির্মাণ করা হোক। তাহলে মুসল্লি, স্থানীয় বাসিন্দা এবং দূর-দূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীদের দুর্ভোগ দূর হবে।’
আশিদ্রোন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রনেন্দ্র প্রসাদ বর্ধন জহর মন্তব্য করেন, ‘মসজিদটির ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব রয়েছে। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এখানে আসেন। শুধু মুসলিম ধর্মাবলম্বীরাই নন, অন্যান্য ধর্মের মানুষও এই প্রাচীন স্থাপনাটি দেখতে আসেন। পর্যটন সম্ভাবনার দিক থেকেও এটি গুরুত্বপূর্ণ।’
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমান আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘গায়েবি মসজিদটি শ্রীমঙ্গলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় স্থাপনা। এর ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং দর্শনার্থীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’





