রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে নিহত
‘পুতের লাশটা আইন্না দেন শেষবার মুখটা দেহি’

ছবি: আগামীর সময়
‘পড়ালেহা ছাইড়া বিদেশ গেছিল, সংসারের অভাব দূর করতে। দেশে আইয়া বাড়িঘর করবে। ইট কিন্না রাখছি। বিয়াও করবে কইছে। অহন জীবনের লিগা দূর হয়ে গেল। দেড় মাস আগে কথা অইছে। বলছে, ভালো আছে, কাজ করতাছে। আমগরে চিন্তা করবার না করছে। মোবাইলে নেট সমস্যা। কোনো কথা কইলে, ম্যাসেজ কইয়া রাখবার কইছে। তারপর থেইক্কা মোবাইল বন্ধ। মোবাইলে দেখি বন্দুকসহ আমার ছেলের ছবি। লেইক্কা দিছে যুদ্ধে মইরা গেছে। পুতে কোম্পানির চাকরিতে গেছে, যুদ্ধে গেল কেমনে? কলিজার টুকরারে দালাল কোম্পানির কথা কইয়া নিয়া যুদ্ধে দিছে। আমার পুতের লাশটা আইন্না দেন শেষ বারের মতো মুখটা দেহি’— এভাবেই বিলাপ করে কথাগুলো বলছিলেন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে নিহত যুবক আব্দুর রহিমের মা রমিছা খাতুন।
ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার পুটিজানা ইউনিয়নের নামাপাড়া গ্রামের আজিজুল হকের ছেলে আব্দুর রহিম (৩০)। তিন ভাইয়ের মধ্যে সে সবার বড়। জমি-জমা নেই বললেই চলে। তার বাবা স্থানীয় একটি মসজিদের ইমাম।
আব্দুর রহিম ২০১১ সালে ধামর আফাজিয়া দাখিল মাদ্রাসা থেকে দাখিল, ২০১৪ সালে ফুলবাড়িয়া কেআইসিনিয়র ফাজিল মাদ্রসা থেকে আলিম পাস করেন। টাঈাইলে সরকারি এম এম আলী কলেজ উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগে দ্বিতীয় বর্ষে পড়া অবস্থায় সংসারের হাল ধরতে ছেড়ে দেন পড়াশোনা।
ছোট দুই ভাইয়ের লেখাপড়ার খরচ ও সংসারের অভাব দূর করতে ২০১৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে প্রায় ৬ লাখ টাকা ঋণ করে সিঙ্গাপুরে পাড়ি জমান আব্দুর রহিম। সেখানে প্রায় সাত বছর কাটালেও তেমন সাফল্য পাননি। ২০২৩ সালের আগস্টে দেশে ফিরে আবার বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা শুরু করেন। পরে আরও ৩ লাখ টাকা ঋণ করে এক দালালের মাধ্যমে সিনোপেক কোম্পানির ভিসায় ২০২৪ সালের ৭ ডিসেম্বর রাশিয়ায় যান। সেখানে প্রথমে একটি শিপে কাজ করেন।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, বায়ুবিদ্যুৎ কোম্পানিতে চাকরির কথা বলে পাঁচ মাস আগে বাড়ি থেকে আরও ৩ লাখ টাকা নেন। জমি বন্ধক রেখে সেই টাকা জোগাড় করে পরিবার। নতুন ও পুরনো কোম্পানির বেতন মিলিয়ে গত ১৬ এপ্রিল তিনি বাড়িতে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা পাঠান। তবে তিনি যে রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছেন বা ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, সে বিষয়ে কিছুই জানতেন না পরিবারের সদস্যরা।
আজ মঙ্গলবার দুপুরে সরেজমিন দেখা গেছে, পুটিজানা নামাপাড়া গ্রামের মুন্সিবাড়িতে চলছে শোকের মাতম। আশপাশের গ্রামের মানুষ ও প্রতিবেশীদের ভিড়ে বাড়িটি উপচে পড়ছে। ভাঙাচোরা পুরনো টিনশেডের দুটি ঘর, নতুন বাড়ি করার জন্য কেনা কিছু ইট— সব মিলিয়ে অভাবের চিত্র স্পষ্ট। এক ঘরের ভেতরে ছেলেহারা মায়ের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। বাইরে বসে অঝোরে কাঁদছিলেন বৃদ্ধ বাবা। তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মু. কামরুল হাসান মিলন ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শহীদুল ইসলাম সোহাগ। পরিবারের একটাই দাবি, যেভাবেই হোক ছেলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হোক।
প্রথমে ওয়ার্কশপের কাজের কথা বলে রাশিয়ায় নেওয়া হয়েছিল। পরে এক দালাল নতুন কোম্পানিতে চাকরির কথা বলে তাকে রুশ সেনাবাহিনীতে যুক্ত করে, যা আমরা জানতাম না
প্রতিবেশীরা জানান, আব্দুর রহিম শান্ত স্বভাবের ছেলে ছিলেন। সংসারের অভাবের কারণে লেখাপড়া ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমান। বিদেশ থেকে টাকা পাঠিয়ে ছোট দুই ভাই আব্দুর রহমান ও আ. রাজ্জাকের লেখাপড়ার খরচ চালানোর পাশাপাশি পরিবারের ভরণপোষণ করতেন। এখন পরিবারের উপার্জনের মতো আর কেউ রইল না।
নিহতের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, সিঙ্গাপুর থেকে দেশে ফিরে প্রায় এক বছর বাড়িতে ছিলেন রহিম। এরপর এক দালালের মাধ্যমে প্রায় ১৮ মাস আগে রাশিয়ায় যান। সেখানে যাওয়ার পর তিন থেকে চার মাস পরপর সামান্য কিছু টাকা পাঠাতেন। গত এক মাস আগে প্রায় দেড় লাখ টাকা পাঠানোর পর পরিবারের সদস্যরা ভেবেছিলেন তিনি হয়তো ভালো কোনো কাজ পেয়েছেন।
গত ২৮ তারিখ ছোট ভাইয়ের মোবাইলে ম্যাসেজ দিয়ে রহিম জানান, তিনি যেখানে কাজ করেন সেখানে মোবাইল নেটওয়ার্কের সমস্যা রয়েছে, তাই ফোনে কথা বলা যায় না। কোনো প্রয়োজন হলে মেসেজে জানাতে বলেন। এরপর থেকেই তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল।
রহিম রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে যোগ দিছে, জানতাম না। পরে শুনি ড্রোন হামলায় মারা গেছে। সরকারের কাছে আবেদন, আমার ছেলের লাশটা দেশে আনার ব্যবস্থা করেন
রহিমের সঙ্গে রাশিয়ার একটি ক্যাম্পে রুশ সেনাসদস্য হিসেবে থাকা লিমন দত্ত নামের এক যুবক গত রবিবার তার ভাই আব্দুর রাজ্জাককে ফোন করে জানান, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় তিনি নিজে একটি পা হারিয়ে চিকিৎসাধীন। একই হামলায় রহিম এবং কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার রিয়াদ নামের আরেক যুবক নিহত হয়েছেন। পরে রিয়াদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেও মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হয় রহিমের পরিবার।
নিহতের মেজো ভাই রাজ্জাক বলেছেন, ‘প্রথমে ওয়ার্কশপের কাজের কথা বলে রাশিয়ায় নেওয়া হয়েছিল। পরে এক দালাল নতুন কোম্পানিতে চাকরির কথা বলে তাকে রুশ সেনাবাহিনীতে যুক্ত করে, যা আমরা জানতাম না। গত ২ এপ্রিল রাশিয়া নিয়ন্ত্রিত ইউক্রেন সীমান্তে ড্রোন হামলায় তার মৃত্যু হয়েছে বলে জানতে পেরেছি। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে রুশ সেনার পোশাক পরা ও হাতে বন্দুকধরা রহিমসহ পাঁচজনের একটি ছবিও দেখি।’
বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে সবাইকে সচেতন হতে হবে। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে জেনেছি, মরদেহ দেশে আনতে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। সর্বোচ্চ সহায়তা করব
নিহতের বাবা আজিজুল হকের আক্ষেপ, ‘মানুষের কাছ থেকে ধার-দেনা আর জমি বন্ধক রেখে ৬ লাখ টাকা খরচ করে ছেলেকে ওয়েল্ডিংয়ের কাজে বিদেশে পাঠাইছিলাম। পরে বায়ুবিদ্যুৎ কোম্পানিতে চাকরির কথা বলে আরও ৩ লাখ টাকা নেয়।’
‘সে রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে যোগ দিছে, জানতাম না। পরে শুনি ড্রোন হামলায় মারা গেছে। সরকারের কাছে আবেদন, আমার ছেলের লাশটা দেশে আনার ব্যবস্থা করেন।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শহীদুল ইসলাম সোহাগ জানালেন, ‘পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মরদেহ দেশে আনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাঠানো হবে। একই সঙ্গে মানবিক সহায়তাসহ পরিবারের পাশে দাঁড়ানো হবে। কোনো দালালের প্রতারণার শিকার হয়ে থাকলে সে বিষয়েও আইনগত সহায়তা দেওয়া হবে।’
সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মু. কামরুল হাসান মিলন বলেছেন, ‘দালালের খপ্পরে পড়ে এমন ঘটনা ঘটছে। বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে সবাইকে সচেতন হতে হবে। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে জেনেছি, মরদেহ দেশে আনতে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। আমরা সর্বোচ্চ সহায়তা করব।’





