‘মা, আমার কপালে চুমু দাও’ এটাই রিয়াদের শেষ স্মৃতি

মো. রিয়াদ রশিদ। সংগৃহীত ছবি
‘মা, আমার কপালে একটা চুমু দাও’—ফোনের ওপাশ থেকে ছেলের বলা এই শেষ শব্দগুলোই কানে বাজছে নাসরিন আক্তারের। কথাগুলো মনে পড়লেই আর নিজেকে সামলাতে পারছেন না তিনি। কখনও বুক চাপড়ে কান্না, কখনও ছেলের ছবির দিকে তাকিয়ে জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ছেন উঠোনে।
কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার জাফরাবাদ ইউনিয়নের ছোট্ট গ্রাম বাঁশহাটিতে এখন শুধুই শোক আর আহাজারি। যে ছেলে কয়েকদিন আগেও মাকে বলেছিল, ‘মা, আমার জন্য দোয়া করো। আমি নতুন চাকরিতে জয়েন করছি। আর ১১ মাস পর বাড়ি চলে আসব। এসে তোমাকে নিয়ে হজ করতে যাব’—সেই রিয়াদ রশিদ (২৮) রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ভয়াবহ ড্রোন হামলায় নিহত।
পরিবারের কাছে মৃত্যুর খবর পৌঁছায় প্রায় এক সপ্তাহ পর, শুক্রবার রাতে। এরপর থেকেই পুরো এলাকায় শোকের ছায়া।
বারবার ছেলের শেষ ফোনালাপের কথা স্মরণ করে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন মা নাসরিন আক্তার। বললেন, আমি ফোনের ওপাশে ছেলের কপালে চুমু দিলাম। এরপর সে বলল, ‘মা, তুমিও কপাল বাড়াও।’ তখন সে ফোনের ওপাশ থেকে আমাকে চুমু দিল—এটাই ছিল আমার ছেলের শেষ চুমু!’ এ কথা বলতে বলতেই বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন তিনি।
আহাজারি করে শুধু বলছেন, ‘আমার ছেলেটারে একবার ফেরত দেন। আমি শুধু আমার ছেলের মুখটা আরেকবার দেখতে চাই।’
নিহত রিয়াদের বাবা, অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক মো. আব্দুর রশিদ বলছেন, ‘ছেলে কখনো পরিবারকে জানায়নি যে সে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছে। সে শুধু বলেছিল, ‘বাবা, আমি অন্য এক জায়গায় যাচ্ছি। সেখানে নেটওয়ার্কের সমস্যা। নেট পেলে তোমাকে ফোন করব। গত ২৮ এপ্রিল এটাই ছিল আমার সঙ্গে তার শেষ কথা।’
‘আমি যদি জানতাম আমার ছেলে যুদ্ধে যাচ্ছে, কিছুতেই তাকে যেতে দিতাম না। সরকারের কাছে আমার একটাই দাবি, আমার ছেলের লাশটা যেন দেশে আনা হয়,’ বলছিলেন তিনি।
রিয়াদের বড় ভাই নিজেও প্রবাসী। ছোট ভাইয়ের শেষ কথাগুলো স্মরণ করে ভেঙে পড়েছেন। বলছেন, ‘২৮ এপ্রিল রাতে খাবার সময় ভাইয়ের সঙ্গে কথা হয়েছিল। সবার খোঁজ নিল। তারপর বলল, তুমি আর বিদেশে থেকো না। বাড়িতে চলে আসো। বাবা-মায়ের দায়িত্বটা তুমি দেখো।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘আমার ভাই বলেছে তোমার আর কষ্ট করতে হবে না। আমি আছি। সেই ভাইটাই আজ নেই! আমি শুধু আমার ভাইয়ের মরদেহটা ফেরত চাই। যেন তাকে নিজের হাতে কবর দিতে পারি।’
ভাইয়ের স্মৃতিচারণ করে ছোট ভাই পিয়াস বললেন, ‘ভাই অনেক টাকা পাঠিয়ে বলছিল তুই একটা মোটরসাইকেল কিনে নে। আমি বললাম, তুমি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে টাকা পাঠাইছো, আমি এই টাকা নষ্ট করব না। তখন ভাই হেসে বলল, তোদের ভালো রাখতেই তো আমি এখানে আসছি।’
তার ভাষ্য, ‘ভাই মৃত্যুর আগে কে কত টাকা পাবে, কার কাছে কত ঋণ আছে সব হিসাব লিখে রেখে গেছে। কিন্তু আমরা কেউ জানতাম না ভাই সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছে। পরে জানতে পারি। সঙ্গে থাকা মানুষজন বলতেছে আমার ভাই নাকি আগুনে পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে, আমি এই কথা কীভাবে মানি?’
২০২৪ সালের অক্টোবরে একটি কোম্পানির কাজে রাশিয়ায় যান রিয়াদ রশিদ। পরিবারের সদস্যরা ধারণা করেছিলেন, তিনি সেখানে বেসরকারি চাকরি করতেন। কিন্তু পরে যোগ দেন রুশ সেনাবাহিনীতে।
গত ১ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে সেনাবাহিনীতে যুক্ত হলেও বিষয়টি পরিবারের কাউকে জানাননি তিনি। শুক্রবার সন্ধ্যায় রিয়াদের বন্ধু লিমন দত্ত মেসেঞ্জারের মাধ্যমে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে মৃত্যুর খবর জানান। লিমন নিজেও একই ক্যাম্পে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ড্রোন হামলায় তিনি একটি পা হারিয়েছেন বলেও জানা গেছে।
পরিবার জানায়, গত ২ মে রুশ সীমান্ত এলাকায় ইউক্রেনীয় বাহিনীর ড্রোন হামলায় রিয়াদ রশিদসহ দুই বাংলাদেশি ও একজন নাইজেরীয় নাগরিক নিহত হন। আহত হন আরও তিনজন।
জাফরাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু সাদাৎ মো. সায়েম বলেছেন, ‘ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। আমি নিহতের পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছি। পুরো এলাকা শোকে স্তব্ধ।’
করিমগঞ্জ থানার ওসি মো. এমরানুল কবির বলেছেন, ‘পুলিশ রিয়াদ রশিদের বাড়িতে গিয়ে স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে।’
করিমগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে মুসলিমা জানিয়েছেন, স্থানীয় জাফরাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের মাধ্যমে আমি বিষয়টি জানতে পারি। নিহতদের বাড়িতে গিয়ে বিস্তারিত জেনে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।




