বর্ষা এলেই নির্ঘুম রাত, টিলা ধসের আতঙ্কে হাজারো মানুষ

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের লাখাইছড়া চা বাগানে টিলা। ছবি: আগামীর সময়
বর্ষার রাতে বৃষ্টি নামলেই ঘুম ভেঙে যায় মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের লাখাইছড়া চা বাগানের সবিতা তাঁতীদের। টিনের ছাউনি পেরিয়ে বৃষ্টির শব্দ যত বাড়ে, ততই বাড়তে থাকে টিলা ধসে ঘর চাপা পড়ার শঙ্কা। সন্তানদের বুকে জড়িয়ে নির্ঘুম রাত কাটান তারা। নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সামর্থ্য না থাকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়েই টিলার পাদদেশে বসবাস করছেন।
শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন পাহাড় ও টিলা ঘেঁষা এলাকায় বসবাসকারী হাজারো মানুষের কাছে বর্ষা মানেই আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা আর মৃত্যুভয়।
লাখাইছড়া এলাকার বাসিন্দা সুমন তাঁতী, ফ্রান্সিস কন্দ, জয়ন্তী ভূমিজ ও নমিতা তাঁতী, তারা সবাই দিনমজুর। নিরাপদ স্থানে বাড়ি করার সামর্থ্য নেই। সন্তানদের ঘরে রেখে কাজে গেলেও সারাক্ষণ দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, একদিকে ভারী বর্ষণ, অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে চলা অবাধ টিলা কাটার কারণে ধসের ঝুঁকি আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রভাবশালী একটি চক্র বসতবাড়ি, রিসোর্ট, বাগান নির্মাণ এবং মাটি বিক্রির উদ্দেশ্যে টিলা কেটে চলেছে। এতে পাহাড়ের স্বাভাবিক গঠন দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং বর্ষাকালে ধসের আশঙ্কা আরও তীব্র হচ্ছে। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের তালিকা প্রস্তুত করা হলেও স্থায়ী পুনর্বাসনের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
সম্প্রতি সময়ে সরেজমিনে কালিঘাট ইউনিয়নের লাখাইছড়া চা বাগান এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, টিলার ওপর ও পাদদেশে অন্তত ৩০টির বেশি পরিবার বসবাস করছে। টানা বৃষ্টির মধ্যে এসব পরিবারের সদস্যরা প্রতিটি মুহূর্ত কাটাচ্ছেন টিলাধসের শঙ্কায়।
লাখাইছড়ার বাসিন্দারা জানান, প্রতিবছরই বর্ষায় টিলা ধসে ঘরবাড়ির ক্ষয়ক্ষতি হয়। এবারও তাদের বসতির পাশের টিলায় বড় ধরনের ফাটল দেখা দিয়েছে। যে কোনো সময় ধস নামতে পারে। সমতলে বসবাসের মতো জায়গা না থাকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়েই সেখানে থাকতে হচ্ছে।
তারা জানান, এই টিলার পাশের আরেকটি টিলায় তিন বছর আগে পাহাড় ধসে চারজনের মৃত্যু হয়েছিল। এরপর থেকে মাটি আরও দুর্বল হয়ে গেছে। তাই দ্রুত নিরাপদ স্থানে পুনর্বাসনের জন্য বাগান কর্তৃপক্ষ ও সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার সিন্দুরখান, কালাপুর, আশিদ্রোন, কালিঘাট, রাজঘাট ও মির্জাপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন চা বাগান ও গ্রামে প্রায় ১০ হাজার মানুষ পাহাড় ও টিলার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করছেন।
উপজেলার রাধানগর, মোহাজিরাবাদসহ বিভিন্ন এলাকায় টিলা কেটে বসতবাড়ি, রিসোর্ট ও দোকান নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। কোথাও টিলা কেটে রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে, আবার কোথাও দখল করা হয়েছে ছড়া। অনেক টিলার গায়ে এখনও নতুন করে মাটি কাটার চিহ্ন স্পষ্ট।
২০২২ সালের ১৯ আগস্ট কালিঘাট ইউনিয়নের লাখাইছড়া চা বাগানে টিলাধসে হীরামনি ভূমিজ, পূর্ণিমা ভূমিজ, রাধা মাহালি ও শকুন্তলা ভূমিজ নামে চার নারী শ্রমিক নিহত হন। ওই ঘটনার পরও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মানুষের বসবাস কমেনি।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানান, পাহাড় ও টিলার পাদদেশে বসবাসকারী অধিকাংশ পরিবারই দরিদ্র ও ভূমিহীন। অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণে ঝুঁকি নিয়ে সেখানে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। তাই স্থায়ী পুনর্বাসনের কোনো বিকল্প নেই।
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) অনুযায়ী অনুমতি ছাড়া টিলা কাটা দণ্ডনীয় অপরাধ।
মৌলভীবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মাইদুল ইসলাম বলেছেন, ‘খবর পেলেই আমরা অভিযান পরিচালনা করি এবং মামলা করি। তবে শুধু আইন প্রয়োগ করে সমস্যার সমাধান হবে না। এ বিষয়ে মানুষের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমান বললেন, ‘বর্ষার শুরু থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের সতর্ক করা হয়েছে। বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ টিলা দ্রুত সরেজমিন পরিদর্শন করে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’







