মুক্ত সুন্দরবনে ফের দস্যু

একসময় সুন্দরবনে সক্রিয় ছিল বিভিন্ন দস্যু বাহিনী। মুক্তিপণ দাবিতে অপহরণ করা হতো জেলে ও বনজীবীদের। মুক্তিপণ না দিলে কেড়ে নেওয়া হতো প্রাণ। দস্যুদের বিভিন্ন বাহিনীর আত্মসমর্পণের পর কেটে গিয়েছিল সেই আতঙ্ক। স্বস্তি নিয়ে মাছ শিকার করেছিলেন জেলেরা। বনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবনেও ফিরে এসেছিল স্বস্তি। দীর্ঘদিন পর আবারও বেড়েছে দস্যুদের উৎপাত। পাওয়া যাচ্ছে বনজীবীদের অপহরণের পর মুক্তিপণ আদায়ের খবরও।
জেলে ও বনজীবীদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ছিল না এই আতঙ্ক। গহিন বনে ডিঙিতে একা থাকলেও ছিল না চিন্তা। এখন বনে ঢুকলেই গা ছমছম করে। কখন জানি এসে হানা দেয় দস্যুরা। বাড়িতেও স্বজনরা সবসময় থাকেন উৎকণ্ঠায়।
২০১৮ সালে আত্মসমর্পণ ও পুনর্বাসনের মধ্য দিয়ে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছিল সুন্দরবনকে। এর পর থেকে সুন্দরবনে ফিরে এসেছিল শান্তির সুবাতাস। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে ধীরে ধীরে পাল্টে যেতে থাকে সেই দৃশ্যপট। ফের দস্যুদের রাজত্বে পরিণত হয় সুন্দরবন। শান্ত বনের সেই নদ-নদী ও খাল আবারও হয়ে উঠেছে ভয়ংকর। এ অবস্থায় বনে যেতে ভয় পাচ্ছেন জেলে-মৌয়ালরা, যার প্রভাব উপকূলের অর্থনীতিতে পড়তে শুরু করেছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরীর মতে, আত্মসমর্পণকারী দস্যুদের টেকসই পুনর্বাসন না করায় জীবিকার তাগিদে হয়তো তারা আবার ফিরছেন পুরনো দস্যু পেশায়। সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা এবং নিয়মিত নজরদারি না থাকায় সৃষ্টি হয়েছে এই পরিস্থিতি।
২০১৮ সালে আত্মসমর্পণ ও পুনর্বাসনের মধ্য দিয়ে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছিল সুন্দরবনকে। এরপর ফিরে এসেছিল শান্তির সুবাতাস
অবশ্য নতুন করে দস্যুদের উত্থানের পর থেকেই তৎপর রয়েছে কোস্ট গার্ড। নিয়মিত অভিযানের পাশাপাশি চলছে ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’ এবং ‘অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন’ নামে দুটি বিশেষ অভিযান। এসব অভিযানে উদ্ধার হয়েছে অস্ত্র ও গোলাবারুদ। আটক হয়েছেন অর্ধশতাধিক দস্যু। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে বনজীবীদের নিরাপত্তায় সতর্ক রয়েছে বন বিভাগও।
কোস্ট গার্ডের তথ্যমতে, ২০১৬-১৮ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ধাপে ধাপে ৩২টি দস্যু বাহিনীর ৩২৮ সদস্য করেন আত্মসমর্পণ। জমা দেন ৪৬২টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ২২ হাজার ৫০৪টি গোলাবারুদ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে চলতি বছরের ৭ মে পর্যন্ত ৪৭টি অভিযান চালিয়েছে কোস্ট গার্ড। এসব অভিযানে আটক করা হয়েছে ৬৫ বনদস্যুকে। উদ্ধার হয়েছে দেশি-বিদেশি ৫৮টি আগ্নেয়াস্ত্র, ২৩৪টি তাজা কার্তুজ, ৩১৭টি ফাঁকা কার্তুজ, দুটি হাতবোমা ও ১ হাজার ৯৫০টি স্প্লিন্টার। এ ছাড়া উদ্ধার করা হয়েছে বনদস্যুদের হাতে জিম্মি ৭৯ জেলে, এক পর্যটক ও এক রিসোর্ট মালিককে।
২০১৬ সালের ৩১ মে মাস্টার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে সুন্দরবনে কমতে শুরু করে আতঙ্ক। ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর সুন্দরবনকে ঘোষণা করা হয় দস্যুমুক্ত। এরপর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যান দস্যুরা।
তাদের কয়েকজনের অভিযোগ, স্বাভাবিক জীবনে ফেরার জন্য নিরাপত্তা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল সরকারের তরফ থেকে। বিভিন্ন উৎসবে দেওয়া হতো উপহার; কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর বন্ধ হয়ে যায় সরকারি সহায়তা। স্বাভাবিক জীবনে ফিরেও বয়ে বেড়াতে হয়েছে সেই পুরনো অপবাদ। সাবেক দস্যু শুনলে ভয়ে আর কেউ কাজে নিতে চান না তাদের। নিজ এলাকার বাইরে কোনো অপরাধ সংঘটিত হলেও তাদের সম্পৃক্ততা দেখিয়ে করা হয় মামলা। এ কারণে অনেকটা ক্ষোভ ও হতাশায় আবারও অস্ত্র হাতে সেই অপরাধ জগতে ফিরেছেন…অনেকেই।
সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন আবার দস্যুতায় ফেরা জাহাঙ্গীর বাহিনীর প্রধান জাহাঙ্গীর শেখ, দাদা ভাই বাহিনীর প্রধান জয়নাল আবেদীন ওরফে রাজন ও মানজুর বাহিনীর প্রধান মানজুর সরদার। ক্ষোভ জানিয়ে তারা বলছিলেন, দস্যুতা ভালো লাগে না। বাধ্য হয়ে এসেছেন। তবে সামাজিক মর্যাদা, নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা পেলে ফিরবেন স্বাভাবিক জীবনে।
দস্যুদের পুনরুত্থানের পর থেকে এখন পর্যন্ত এক হাজারের বেশি বনজীবী অপহরণ ও নির্যাতনের শিকার হওয়ার তথ্য দিয়েছেন জেলেরা। এক মাসে মুক্তিপণ দিয়ে ফিরেছেন শতাধিক জেলে ও মৌয়াল।
বনজীবীদের নিরাপত্তায় টহল জোরদারের কথা জানালেন সুন্দরবন পূর্ব বিভাগ বাগেরহাটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করীম চৌধুরী। তিনি বললেন, ‘বনদস্যুদের দৌরাত্ম্যে জেলে-মৌয়ালদের জীবন-জীবিকা পড়েছে ঝুঁকির মধ্যে। তবে বন বিভাগের সক্ষমতা না থাকায় দস্যুদের বিরুদ্ধে সম্ভব হয় না এককভাবে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া। তাই দস্যু দমনে কোস্ট গার্ডসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতা করছেন তারা।’




