বাবা নেই, মায়ের কাছেও হয়নি ঠাঁই : থানায় দুই শিশু

ছবি: আগামীর সময়
যে বয়সে বই-খাতা কাঁধে নিয়ে স্কুলে যাওয়ার কথা, বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলায় মেতে ওঠার কথা, সেই বয়সেই জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার দুই শিশু—সিয়াম ও রিফাত।
চার বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় বাবাকে হারানোর পর তাদের জীবনে নেমে আসে অনিশ্চয়তা। মায়ের মানসিক অসুস্থতার কারণে ঘরেও মেলেনি নিরাপদ আশ্রয়। শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা আর একটু নিরাপত্তার আশায় তারা ছুটে যায় সরাইল থানায়।
উপজেলার বড্ডাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা দুই ভাইয়ের বাবা বাছির মিয়া ছিলেন সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক।
পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটি সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার পর ভেঙে পড়ে পুরো পরিবার। স্থানীয়দের ভাষ্য, মা আসমা আক্তার দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। ফলে সন্তানদের নিয়মিত দেখাশোনা ও লালন-পালন করা তার পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠেনি।
স্থানীয় সূত্র জানায়, বাবার মৃত্যুর পর কার্যত অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে সিয়াম ও রিফাত। কখনো প্রতিবেশীর দেওয়া খাবারে, কখনো বা মানুষের সহানুভূতির ওপর নির্ভর করে কেটেছে তাদের দিন। অনেক সময় না খেয়েই থাকতে হয়েছে। রাত কাটাতে হয়েছে অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে। শিক্ষা, নিরাপত্তা আর স্বাভাবিক শৈশব—সবকিছু থেকেই যেন ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে তারা।
নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা দুশ্চিন্তায়। একসময় স্থানীয় কয়েকজন স্কুলপড়ুয়া শিশুর সহায়তায় সরাসরি সরাইল থানায় যায় দুই ভাই। সেখানে পুলিশের কাছে তারা একটাই আবেদন জানায়, আমাদের একটা ব্যবস্থা করে দিন। আমরা এভাবে আর থাকতে চাই না।
দায়িত্বে থাকা সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) কারুন বিল্লাহ শিশু দুটির কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন। তাদের অসহায় অবস্থার কথা জানতে পেরে তিনি বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করেন এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার উদ্যোগ নেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা বললেন, দুই শিশুর জন্য স্থায়ী কোনো অভিভাবক বা নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা না হলে তাদের ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। তারা প্রশাসন, সমাজসেবা অধিদপ্তর এবং সমাজের বিত্তবান মানুষের সহযোগিতা কামনা করেন।
সরাইল থানার ওসি মঞ্জুর কাদের ভূঁইয়া জানান, শিশুরা থানায় আসার পর তার মাকে খবর দিয়ে না হয়। যেহেতু তার মা-ই বৈধ অভিভাবক, সেজন্য তার জিম্মায় শিশু দুটিকে দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানিয়েছেন, তাদের সহায়তা করার জন্য সমাজের বিত্তশালীদের আহ্বান জানানো হয়েছে।
সিয়াম ও রিফাতের গল্প শুধু দুটি শিশুর ব্যক্তিগত বেদনার কাহিনি নয়; এটি আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতারও নির্মম প্রতিচ্ছবি। একটি শিশু যখন নিজের নিরাপত্তা ও আশ্রয়ের খোঁজে থানার দরজায় কড়া নাড়তে বাধ্য হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনের জায়গাগুলো নিয়েও।
তবে এই ঘটনায় আশার একটি দিকও রয়েছে। অসহায় দুই শিশুর আবেদন ফিরিয়ে না দিয়ে পুলিশ মানবিকতার পরিচয় দিয়েছে। এখন প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা, সমাজসেবা বিভাগ, শিশু সুরক্ষাবিষয়ক প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের সচেতন মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ।
কারণ প্রতিটি শিশুরই অধিকার রয়েছে নিরাপদ আশ্রয়, শিক্ষা, স্নেহ ও মর্যাদাপূর্ণ শৈশবের। সিয়াম ও রিফাতের মতো কোনো শিশুই যেন পারিবারিক সংকট, দারিদ্র্য কিংবা অবহেলার কারণে ভবিষ্যতের স্বপ্ন হারিয়ে না ফেলে—এ প্রত্যাশাই আজ সবচেয়ে বড়।






