টার্গেট কিলিং থেকে চাঁদাবাজি, ডেভিড ইমন কি থামলেন?
- রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আলোচিত নাম
- চট্টগ্রাম শহরসহ তিন স্থানে চাঁদা আদায়ের দায়িত্বে
- হত্যাসহ ১৩ মামলা, গ্রেপ্তার, আবার জামিনে মুক্তি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর চট্টগ্রামের অপরাধজগতে আলোচিত নাম হয়ে ওঠে ছোট সাজ্জাদ, রায়হান, মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমনসহ আরও কয়েকজন। তাদের ‘গডফাদার’ হিসেবে নাম আসে বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের। ঘটে একের পর এক খুন, চাঁদাবাজি, প্রকাশ্যে গুলিবর্ষণসহ আরও নানা ঘটনা।
বেপরোয়া হয়ে ওঠা সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ ২০২৫ সালের ১৫ মার্চ ঢাকার বসুন্ধরা থেকে গ্রেপ্তারের পর এখন কারাগারে আছেন। এরপর রায়হান ও ডেভিড ইমন পুরো বাহিনী নিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছিলেন চট্টগ্রামে। আলোচনা আছে, তারা প্রভাবশালী বিভিন্ন গোষ্ঠীর আশ্রয়-প্রশ্রয় পাচ্ছিলেন। মূর্তিমান আতঙ্কে পরিণত হওয়া রায়হান-ইমনের প্রশ্নে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও অসহায় দেখা গিয়েছিল। এর ফলে তাদের আটকানো প্রায় অসম্ভব বলেই মনে করা হচ্ছিল।
শেষ পর্যন্ত দুই বছর ধরে দাপিয়ে বেড়ানো ডেভিড ইমন পুলিশের জালে ধরা পড়ল যশোরে। এখন বাকি রায়হান।
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলম আগামীর সময়কে বললেন, ‘রায়হানকে গ্রেপ্তারেও আমাদের টিম কাজ করছে। নোয়াখালীতে অবস্থানের তথ্য পেয়ে অভিযান চালানো হয়েছিল। অল্পের জন্য পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। তাদের বাহিনীর সব সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হবে।’
চট্টগ্রাম ও যশোর জেলা পুলিশের যৌথ অভিযানে আজ বুধবার ভোরে যশোরের কোতোয়ালি থানার ঝুমঝুমপুর এলাকা থেকে তিন সহযোগীসহ ধরা পড়েন ডেভিড ইমন। তিন সহযোগী হলেন, আলিস তমাল, শাফায়াত ও শামীম।
ডেভিড ইমন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর ইউনিয়নের কাঞ্চননগর গ্রামের মোহাম্মদ মুসার ছেলে। নগরীর বায়েজিদ বোস্তামি থানার আতুরার ডিপো এলাকায় তাদের বাসা। পুলিশ তার বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত ১৩টি মামলার তথ্য পেয়েছে। এর মধ্যে তিনটি হত্যাসহ ১০টি মামলা নগরীতে। বাকি তিনটি হাটহাজারী, রাউজান ও ফটিকছড়ি জেলায়।
দুই বছরে তারা কমপক্ষে এক ডজন টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনা ঘটায়। আন্ডারওয়ার্ল্ডের বিরোধ, আধিপত্যের দ্বন্দ্ব, চাঁদাবাজি, বালুমহালের নিয়ন্ত্রণ এবং পূর্ববিরোধের প্রতিশোধ নিতে গিয়ে পুরো চট্টগ্রামকে অস্থির করে রাখে তারা
নগর পুলিশের এক কর্মকর্তা বললেন, ‘চাঁদার জন্য গুলিবর্ষণ করে ত্রাস সৃষ্টি, মারধর, হত্যাচেষ্টার অনেক ঘটনা ডেভিড ইমনের নেতৃত্বে হয়েছে। কিন্তু ভয়ে তার বিরুদ্ধে অনেকেই মামলা করেনি। বাকলিয়ায় ইন্টারনেট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে যে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে, সেটাও তার নির্দেশে হয়েছে। কিন্তু মামলায় তার নাম উল্লেখ করা হয়নি।’
বিদেশে পলাতক দুর্ধর্ষ শিবির ক্যাডার সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের বাহিনীর সদস্যরা আওয়ামী লীগ আমলের শেষদিকে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। বাহিনীর নিয়ন্ত্রক দেশে থাকা ছোট সাজ্জাদকে ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিল। ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের ১২ দিনের মাথায় হত্যাসহ ১০ মামলায় জামিন পেয়ে তিনি কারামুক্ত হন। এরপর রায়হান ও ডেভিড ইমনকে নিয়ে ছোট সাজ্জাদের বেপরোয়া কর্মকাণ্ড শুরু হয়।
২০২৫ সালের ৮ জানুয়ারি ডেভিড ইমন নগরীর বায়েজিদ বোস্তামি থানা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হয়। কয়েকদিনের মধ্যেই জামিনে বেরিয়ে যান। এরপর গ্রেপ্তার হয় ছোট সাজ্জাদ।
২০২৫ সালের ২৯ মার্চ গভীর রাতে নগরীর বাকলিয়া এক্সেস রোডে একটি চলন্ত প্রাইভেটকারে গুলি করে দুজনকে খুন করা হয়। ওই কারে আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সরোয়ার হোসেন বাবলা ছিলেন। মূলত তাকে লক্ষ্য করেই গুলি করা হয়েছিল। তিনি প্রাণে বাঁচলেও নিহত হন দুই সহযোগী। পুলিশের ভাষ্য, এ হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ডেভিড ইমন।
ওই বছরের ৫ নভেম্বর নগরীর বায়েজিদ বোস্তামি থানার হাজীপাড়া এলাকায় বিএনপির প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর সঙ্গে নির্বাচনী গণসংযোগে যাওয়া সরোয়ার বাবলাকে গুলি করে খুন করা হয়। পুলিশের ভাষ্য, বাবলার মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে খুন করেছিলেন রায়হান। ডেভিড ইমন-রায়হানের হাতে ওই বছরের ২৩ মে পতেঙ্গায় সন্ত্রাসী আকবর আলী ওরফে ঢাকাইয়া আকবর খুন হন।
জেলা পুলিশের এক পরিদর্শকের ভাষ্য, ‘সরোয়ার বাবলা ও ঢাকাইয়া আকবর খুন হয়েছেন আন্ডারওয়ার্ল্ডের বিরোধে। পথের কাঁটা সরিয়ে দেওয়ার পর বড় সাজ্জাদ বাহিনী অর্থাৎ রায়হান-ইমন আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। দুই বছরে তারা কমপক্ষে এক ডজন টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনা ঘটায়। আন্ডারওয়ার্ল্ডের বিরোধ, আধিপত্যের দ্বন্দ্ব, চাঁদাবাজি, বালুমহালের নিয়ন্ত্রণ এবং পূর্ববিরোধের প্রতিশোধ নিতে গিয়ে পুরো চট্টগ্রামকে অস্থির করে রাখে তারা।’
চট্টগ্রামের অপরাধজগতের তথ্য সংরক্ষণ করা পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার তথ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নিজের আধিপত্য বিস্তারে বড় সাজ্জাদ তার বাহিনীকে তিনটি জোনে ভাগ করে তিনজনকে নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দেন। রাউজান থেকে বোয়ালখালী পর্যন্ত কর্ণফুলী নদীর বালুমহাল নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পায় রায়হান ও তার ২০ জনের টিমের। চট্টগ্রাম শহরে ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ করে বোরহান। তার টিমে আছে বেলাল, হাসান, নাঈম, সোহাগ ও সাজ্জাদের বন্ধু সরওয়ার। ফটিকছড়ি, হাটহাজারী ও চট্টগ্রাম শহরে চাঁদা আদায়ের দায়িত্বে আছে ডেবিড ইমন। এই গ্রুপে আছে ৩০ জনের মতো। আর ছোট সাজ্জাদ ও তার টিম বড় সাজ্জাদের এক চাচাতো ভাইসহ সব টিমের মধ্যে সমন্বয় করত।
সর্বশেষ বাকলিয়ায় ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে হামলা-ভাঙচুরের পর পুরো বাহিনীর সদস্যদের গ্রেপ্তারে তৎপর হয় পুলিশ ও র্যাব।







