গৌরনদীতে ইতিহাসের নীরব সাক্ষী ‘আল্লাহর মসজিদ’

ছবি: আগামীর সময়
বরিশালের গৌরনদী উপজেলার কসবা গ্রামে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক ‘আল্লাহর মসজিদ’। প্রাচীন মুসলিম স্থাপত্যশৈলী, ইতিহাস, লোককাহিনি ও ধর্মীয় আবেগের অনন্য মেলবন্ধন এই স্থাপনাটি। সময়ের পরিক্রমায় মসজিদটি শুধু একটি উপাসনালয় নয়, দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছে। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শনার্থী ও মুসল্লিরা ছুটে আসেন এই প্রাচীন স্থাপনাটি দেখতে।
মসজিদটির নির্মাণকাল সম্পর্কে কোনো শিলালিপি বা লিখিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয়দের ধারণা, পঞ্চদশ শতাব্দীতে হজরত খান জাহান আলী (রহ.)-এর আমলে এটি নির্মিত হয়েছিল। স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকে মসজিদটির সঙ্গে বাগেরহাটের বিখ্যাত ষাট গম্বুজ মসজিদের বেশ মিল রয়েছে।
মসজিদটি প্রায় ৩৮ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৩৮ ফুট প্রস্থের বর্গাকার আকৃতির। এর দেয়াল প্রায় ৭ ফুট পুরু। পাতলা ইট ও চুন-সুরকির সমন্বয়ে এটি নির্মাণ করা হয়েছে।
মসজিদের পূর্ব দেয়ালে রয়েছে তিনটি প্রবেশপথ। উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে রয়েছে একটি করে প্রবেশপথ। মোট পাঁচটি শিখরাকৃতির খিলানযুক্ত দরজা রয়েছে মসজিদটিতে। খিলানের ওপর ফুল ও ডায়মন্ড আকৃতির নান্দনিক অলংকরণ আজও দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।
৯ গম্বুজবিশিষ্ট এই মসজিদের ভেতরে রয়েছে চারটি পাথরের স্তম্ভ। পশ্চিম দেয়ালে রয়েছে তিনটি মিহরাব। এর মধ্যে মাঝের মিহরাবটি আকারে বড়। চারপাশের কার্নিশ ও কোনার স্তম্ভগুলো মসজিদের সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
ঐতিহাসিক এই মসজিদ দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করেন পর্যটকরা। কেউ আসেন প্রাচীন স্থাপত্য দেখতে। কেউ আসেন ধর্মীয় অনুভূতি থেকে। আবার অনেকে মানত পূরণ ও নফল নামাজ আদায়ের জন্য এখানে আসেন।
মসজিদ কমপ্লেক্সের চারপাশে রয়েছে প্রশস্ত হাঁটার পথ। পূর্ব পাশে রয়েছে একটি বড় দীঘি। সেখানে নারী ও পুরুষের জন্য পৃথক ওজু ও গোসলের ব্যবস্থা রয়েছে। নারীদের নামাজ আদায়ের জন্যও রয়েছে আলাদা স্থান।
মসজিদের খাদেম বাবুল ফকির জানান, তিনি প্রায় ৪০ বছর ধরে মসজিদটির দায়িত্ব পালন করছেন। পূর্বপুরুষদের মুখে শোনা নানা লোককাহিনির কথাও তুলে ধরেন তিনি।
তার ভাষ্য, স্থানীয়ভাবে প্রচলিত আছে যে প্রায় সাতশ বছর আগে জিন দ্বারা মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল। এমন অলৌকিক কাহিনির কারণেই এটি ‘আল্লাহর মসজিদ’ নামে পরিচিতি পেয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা তারেক মাহমুদ বলেছেন, ‘মসজিদটির নকশা, গম্বুজ, প্রবেশপথ ও অলংকরণে ষাট গম্বুজ মসজিদের ছাপ স্পষ্ট। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ মসজিদটি দেখতে আসেন।
মানত নিয়ে আসা ফাহাত হোসেন বলেছেন, ‘প্রবাসে যাওয়ার আগে মায়ের মানত পূরণ করতে এখানে এসেছি। নফল নামাজ আদায় করেছি। মসজিদটির পরিবেশ ও সৌন্দর্য আমাকে মুগ্ধ করেছে।’
গৌরনদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইব্রাহিম বলেছেন, ‘ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি আমি একাধিকবার পরিদর্শন করেছি। বর্তমানে এর সংরক্ষণ ও দেখভালের দায়িত্বে রয়েছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর।’
ইতিহাস, স্থাপত্য ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের অনন্য সমন্বয়ে গড়ে ওঠা কসবার আল্লাহর মসজিদ আজ দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। এ ধরনের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের যথাযথ সংরক্ষণ ও প্রচার দেশের সমৃদ্ধ, ইতিহাস ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।







