ধাঁধার চর: পর্যটনের সম্ভাবনা নাকি ইতিহাস-ঐতিহ্যের নীরব ভাণ্ডার

ছবি: আগামীর সময়
বিস্তীর্ণ নদীর বুকে সবুজে মোড়ানো এক রহস্যময় ভূখণ্ড। চারদিকে জলরাশি, মাঝখানে গাছপালা, ফসলের ক্ষেত আর পাখির কলকাকলি। দূর থেকে দেখলে মনে হবে যেন নদীর বুকে ভেসে থাকা কোনো দ্বীপ।
গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার রাণীগঞ্জ এলাকার কাছে ব্রহ্মপুত্র ও শীতলক্ষ্যা নদের সঙ্গমস্থলে অবস্থিত সেই বিস্ময়কর ভূমির নাম ধাঁধার চর।
প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য, লোককথা, ইতিহাস, কৃষিসমৃদ্ধি ও জীববৈচিত্র্যের অনন্য সমন্বয়ে গড়ে ওঠা ধাঁধার চর এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। কেউ এটিকে দেশের সম্ভাবনাময় প্রাকৃতিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে দেখতে চান, আবার স্থানীয় অনেকেই মনে করেন, অপরিকল্পিত পর্যটন উন্নয়ন এ অঞ্চলের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
স্থানীয়দের মতে, প্রায় দুই শতাব্দী আগে নদীর পলি জমে ধীরে ধীরে সৃষ্টি হয় এই চর। একসময় যেখানে ছিল উত্তাল নদী, আজ সেখানে বিস্তৃত সবুজ ভূমি। নৌকার মতো আকৃতির হওয়ায় দূর থেকে চরটিকে কখনও সেন্টমার্টিন দ্বীপের মতো, আবার কখনও ডুবে যাওয়া টাইটানিক জাহাজের মতো মনে হয়।
চরের উত্তর ও দক্ষিণে শীতলক্ষ্যা নদী, পূর্বদিকে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র। একদিকে কাপাসিয়া, অন্যদিকে নরসিংদীর শিবপুর। ফলে এটি যেন দুই জেলার মাঝখানে ভাসমান এক প্রাকৃতিক দ্বীপ।
বর্ষাকালে চারপাশের নদী টইটম্বুর হয়ে উঠলে ধাঁধার চর সত্যিকারের দ্বীপের রূপ ধারণ করে। আর শীতকালে চরটি হয়ে ওঠে কৃষি ও প্রকৃতির এক সবুজ স্বর্গ।
প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ এই চরে রয়েছে পেয়ারা বাগান, কলাবাগান, কুল, জাম ও তালগাছের সারি। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রজাতির ঔষধি উদ্ভিদও জন্মে এখানে।
স্থানীয় কৃষকরা আলু, সরিষা, ভুট্টা, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফসলের আবাদ করেন। প্রবীণদের মতে, চরের মাটি এতটাই উর্বর যে অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সার ছাড়াই ভালো ফলন পাওয়া যায়।
১৯৬০, ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় চরটি ডুবে গেলেও পরবর্তীতে নতুন পলি জমে উর্বরতা আরও বৃদ্ধি পায়।
চরটির ইতিহাসও কম চমকপ্রদ নয়। স্থানীয় সূত্র ও গবেষকদের মতে, চরটি জেগে ওঠার পর এর মালিকানা নিয়ে ভাওয়াল রাজা ও বলদা রাজার মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। পরবর্তীতে চরটি ভাওয়াল রাজ এস্টেটের অধীনে আসে।
ব্রিটিশ আমলে জরিপের মাধ্যমে কৃষকদের খাজনার বিনিময়ে জমির অধিকার দেওয়া হয়। পরে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলে প্রজাস্বত্ব আইনের আওতায় জমির মালিকানা স্থানীয় কৃষকদের হাতে চলে আসে।
ধাঁধার চরের পশ্চিম পাশের মানি বাড়ির অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা গোলাম মো. হানিফ আজম বলেন, ব্রিটিশ আমলেরও আগে থেকে এই চর রয়েছে। এটি লাখেরাজ জমি ছিল। পরে ভাওয়াল রাজা ও বলদা রাজার মধ্যে বিরোধের পর ভাওয়াল রাজ এস্টেটের অধীনে আসে। বর্তমানে প্রায় তিন শতাধিক জমির মালিক এখানে চাষাবাদ করছেন। ধাঁধার চর নিয়ে অনেক ভুল তথ্য প্রচার করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, পর্যটন কেন্দ্র করার কথা শোনা যাচ্ছে। কিন্তু এখানকার কৃষক, ইতিহাস, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জীববৈচিত্র্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে কোনো উন্নয়ন কাম্য নয়। যদি উন্নয়ন করতেই হয়, তাহলে স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে আলোচনা করে পরিবেশ রক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
ভাওয়ালের আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক ও প্রাক্তন ব্যাংক কর্মকর্তা নাজিব মাহফুজ খান মনে করেন, ধাঁধার চর শুধুমাত্র একটি ভূখণ্ড নয়; এটি নদীর গতিপথ, জনপদ পরিবর্তন ও লোকস্মৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য।
তিনি জানান, কথাসাহিত্যিক আবু জাফর শামসুদ্দীনের স্মৃতিকথায় শীতলক্ষ্যা ও তারাগঞ্জ এলাকার বহু বর্ণনা থাকলেও ধাঁধার চরের কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় না। এ থেকেই ধারণা করা যায়, তখন চরটি হয়তো পুরোপুরি জেগে ওঠেনি অথবা গুরুত্ব পায়নি।
গবেষকদের মতে, ধাঁধার চরের প্রকৃত ইতিহাস জানতে হলে ব্রিটিশ আমলের সিএস জরিপ, পুরোনো মানচিত্র ও নদীপথের ঐতিহাসিক নথি বিশ্লেষণ জরুরি।
ধাঁধার চর শুধু কৃষিভূমি নয়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক আবাসস্থলও। এখানে মাছরাঙা, বক, পানকৌড়িসহ নানা প্রজাতির পাখি দেখা যায়। কখনও কখনও নদীতে বিরল শুশুকও ভেসে ওঠে।
বিকেলের সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ে, তখন পুরো চর লাল-কমলা আভায় রঙিন হয়ে ওঠে। সেই দৃশ্য দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসে।
চরের পূর্বদিকে অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘ঘিঘাট’-এ প্রতিবছর অষ্টমী তিথিতে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা পুণ্যস্নানে অংশ নেন। ফলে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে এই অঞ্চল।
২০২০ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসক এস এম তরিকুল ইসলাম ধাঁধার চর পরিদর্শন করে এর পর্যটন সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছিলেন। এরপর থেকে ধাঁধার চরকে ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার দাবি জোরালো হতে থাকে।
তবে স্থানীয়দের একটি বড় অংশ মনে করেন, পরিকল্পনাহীন পর্যটন উন্নয়ন চরের পরিবেশ, কৃষি ও জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা ইসলাম মিয়া বলেছেন, ধাঁধার চর আমাদের ইতিহাস, কৃষি ও নদীকেন্দ্রিক জীবনের অংশ। উন্নয়ন অবশ্যই হতে হবে, কিন্তু এমনভাবে হতে হবে যাতে প্রকৃতি, কৃষক ও স্থানীয় মানুষের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
ধাঁধার চর আজ একদিকে পর্যটনের অপার সম্ভাবনার প্রতীক, অন্যদিকে ইতিহাস ও লোকস্মৃতির এক অমূল্য ভাণ্ডার। নদীর বুক থেকে উঠে আসা এই সবুজ ভূখণ্ড যেন এখনও বহু অজানা গল্প লুকিয়ে রেখেছে নিজের ভাঁজে।
বাংলার বহু ইতিহাস যেমন লুকিয়ে আছে নদীর চর, হারিয়ে যাওয়া খেয়াঘাট ও মানুষের স্মৃতিতে, তেমনি ধাঁধার চরও হয়তো অপেক্ষা করছে তার প্রকৃত পরিচয় উন্মোচনের জন্য।
প্রশ্ন একটাই ধাঁধার চর কি হবে দেশের নতুন পর্যটন আকর্ষণ, নাকি সংরক্ষিত থাকবে ইতিহাস, কৃষি ও প্রকৃতির অনন্য সম্পদ হিসেবে? সেই উত্তরই এখন খুঁজছে কাপাসিয়ার মানুষ।






