পদ্মার স্রোতে ভুল পথে ভারতে, ১১ দিন পর ফিরলেন পাঁচ বাংলাদেশি

স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয় ভুল করে ভারতে চলে যাওয়া পাঁচ বাংলাদেশিকে। ছবি: সংগৃহীত
রাজশাহীর বাঘায় পদ্মা নদীর তীব্র স্রোতে দিক হারিয়ে ভুল করে ভারতের সীমান্তে ঢুকে পড়া পাঁচ বাংলাদেশি ১১ দিন পর ফিরেছেন দেশে। শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা ৭টার দিকে ভারতের সাগরপাড়া সীমান্তের বিএসএফ ক্যাম্প থেকে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। পরে আলাইপুর বিজিবি ক্যাম্পের মাধ্যমে তারা বাংলাদেশে ফেরেন। দীর্ঘ অপেক্ষার পর স্বজনদের কাছে পাঁচজনকে ফিরিয়ে দেওয়ার সময় আলাইপুরের পদ্মাতীরে তৈরি হয় আবেগঘন পরিবেশ।
ফিরে আসা পাঁচজন হলেন বাঘার পাকুড়িয়া ইউনিয়নের আলাইপুর মধ্যপাড়া গ্রামের গোলাম মোস্তফার ছেলে কলেজছাত্র মোশাররফ হোসেন (২২), ইউনুস মণ্ডলের ছেলে শাহাবুল আলী (৪২), শাজাহান আলীর ছেলে বাবর আলী (৪৫), নৌকার মাঝি জামাল হোসেনের ছেলে আসাদুল ইসলাম (৪১) এবং সামাদ আলীর ছেলে সাইফুল ইসলাম (৫৮)।
ঘটনাটি ঘটে ৭ সেপ্টেম্বর রাতে। কুষ্টিয়ার বাংলাবাজার চর থেকে পাট কিনে নৌকায় বাঘার দিকে ফিরছিলেন তারা। ওই সময় পদ্মায় ছিল তীব্র স্রোত। স্রোতে দিক হারিয়ে অন্ধকারে বুঝে ওঠার আগেই নৌকাটি বাংলাদেশের সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে ঢুকে পড়ে। প্রায় দুই থেকে আড়াই কিলোমিটার ভেতরে যাওয়ার পর বিএসএফের একটি টহল দল তাদের আটক করে। পাটবোঝাই নৌকাটিও জব্দ করা হয়।
আটকের খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যরা আলাইপুর বিজিবি ক্যাম্পে যোগাযোগ করেন। পরে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে পতাকা বৈঠক হয়। তবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া তাদের ফেরত দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানায় বিএসএফ। এরপর শুরু হয় তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া।
পাঁচজনকে দেশে ফেরাতে উদ্যোগ নেন রাজশাহী-৬ (বাঘা-চারঘাট) আসনের সংসদ সদস্য আবু সাঈদ চাঁদ। তিনি রাজশাহীতে নিযুক্ত ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার মনোজ কুমারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। জাতীয় পরিচয়পত্রসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়া হয়। এরপর প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া শেষে শুক্রবার সন্ধ্যায় তাদের মুক্তি দেওয়া হয়।
পদ্মার তীরে স্বজনদের কাছে তাদের গ্রহণ করেন সংসদ সদস্য আবু সাঈদ চাঁদ। পরে পাঁচজনকে পরিবারের সদস্যদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
ছেলেকে কাছে পেয়ে স্বস্তি ফিরে আসে গোলাম মোস্তফার পরিবারে। তিনি বললেন, '১১ দিন ধরে ছেলেকে কাছে না পেয়ে আমরা খুব দুশ্চিন্তায় ছিলাম। প্রতিটি দিন তার ফেরার অপেক্ষায় কেটেছে। আজ ছেলেকে সুস্থভাবে ফিরে পেয়েছি, এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় স্বস্তি।'
বাবর আলীর স্ত্রী হেলেনা বেগমও স্বামীর ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন প্রতিটি দিন। তিনি বললেন, 'এই ১১ দিন স্বামীকে ছাড়া খুব দুশ্চিন্তায় কাটাতে হয়েছে। প্রতিদিন তার ফেরার অপেক্ষায় ছিলাম। আজ তাকে সুস্থভাবে ফিরে পেয়ে পরিবারের স্বস্তি ফিরে এসেছে।'
আসাদুল ইসলামের ভাই সাহারুল ইসলাম জানান, 'আমার ভাইসহ পাঁচজনকে ভারতের রানীনগর থানায় রাখা হয়েছিল। ১১ দিন পর তারা মুক্তি পেয়ে আমাদের কাছে ফিরে এসেছেন।'
আলাইপুর বিজিবি ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার নায়েক সুবেদার মাকসুদুর রহমান বলেছেন, 'বিএসএফের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় তাদের মুক্ত করে আমাদের মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।'
পাঁচজনকে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের সময় আবু সাঈদ চাঁদ বলেন, 'নদীর স্রোতের কারণে ভুলবশত তারা বিএসএফের হাতে আটক হওয়ার পর থেকে আমি কখনও ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনারের কার্যালয়ে, কখনও বিজিবির সিওর সঙ্গে, আবার কখনও জেলা প্রশাসকের দপ্তরে যোগাযোগ করেছি। আমার এলাকার প্রতিটি নাগরিক আমার কাছে নিজ সন্তানের মতো আপন। তাদের পরিবারের কাছে নিরাপদে ফিরিয়ে দিতে পেরে আমি খুশি।'
তিনি আরও বলেন, 'ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনারের সঙ্গে কথা বলেছি। জাতীয় পরিচয়পত্র ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আবেদন জমা দেওয়ার পর তাদের ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। অবশেষে ১১ দিন পর প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় তাদের মুক্ত করে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।'
শুক্রবার সন্ধ্যায় আলাইপুরের পদ্মাতীরে স্বজনদের ফিরে পাওয়ার আনন্দে আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়। দীর্ঘদিন পর প্রিয়জনকে কাছে পেয়ে কেউ জড়িয়ে ধরেছেন, কেউ চোখের পানি মুছেছেন। ১১ দিনের উৎকণ্ঠার পর পাঁচটি পরিবার ফিরে পেল তাদের আপনজনকে। পদ্মার স্রোতে ভুল পথে ভারতে চলে যাওয়া পাঁচজন আবার ফিরলেন নিজের দেশ, নিজের ঘর ও স্বজনদের কাছে।




