গাছ কাটায় ভাঙল শামুকখোলের বাসা, ছানার মৃত্যুতে মামলা দেবে বন বিভাগ

বগুড়ার শেরপুরে পাখির আবাসস্থলের এই কাটা গাছের পাশে পড়ে ছিল শামুকখোলের মৃত ছানারা। ছবি: আগামীর সময়
বগুড়ার শেরপুরে পরিযায়ী পাখির এক যুগ পুরনো কলোনিতে গাছ কাটায় ভেঙেছে পাখির বাসা, নষ্ট হয়েছে ডিম। মারা গেছে শামুকখোল পাখির বেশকিছু ছানাও। উপজেলার গাড়িদহ ইউনিয়নের রামনগর গ্রামের ঘটনা এটি।
স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো এ নিয়ে সরব হলে বন বিভাগের নজরে আসে ঘটনাটি। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা হবে বন্যপ্রাণী আইনে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপজেলার রামনগর গ্রামে হায়েদ আলীর ১৬ শতক জমিতে গড়ে উঠেছে পাখিদের ওই কলোনি। ওয়ারিশসূত্রে জমির মালিক এখন তার ছেলে-মেয়েরা।
২০১৪ সালে থেকে এই গ্রামে পরিযায়ী পাখির আনাগোনা শুরু। হায়েদের জমির ৩০ থেকে ৫০ বছর বয়সী পিতরাজ, জলপাই, বাঁশসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছে বাসা বাঁধে পাখিগুলো। স্থানীয়দের দাবি, সেখানে এখন প্রায় ৫০০ গাছে আছে পাখির বাসা। এর মধ্যে শামুকখোলই বেশি। বর্ষা মৌসুম এই পাখির প্রজননকাল হওয়ায় এই সময়ে এগুলো বাসা বাঁধে। ছানা বড় হলে সেপ্টেম্বরের পর থেকে বাসা ছাড়তে থাকে শামুকখোল।
সম্প্রতি হায়েদের ছেলে আজাহার আলী ও তার অন্য ভাই-বোনরা ওই জমির সাতটি গাছ স্থানীয় কাঠ ব্যবসায়ী চান মিয়ার কাছে বিক্রি করেন। গেল শনিবার থেকে করাতকল দিয়ে গাছগুলো কাটা শুরু হয়। এ সময় মগডাল থেকে পাখিদের শতাধিক বাসা মাটিতে পড়লে ভেঙে যায় অনেক ডিম। বেশকিছু ছানা মারা গেছে বলে স্থানীয়রা জানালেও এর সুনির্দিষ্ট সংখ্যা তারা বলতে পারেনি।
অভিযোগের বিষয়ে আজাহার সরাসরি কথা বলতে রাজি হননি। তার বোনজামাই বাবলু মিয়া জানালেন, নতুন ঘর নির্মাণের জন্য অর্থের প্রয়োজন। এ কারণে তারা গাছগুলো বিক্রি করেছেন। তবে কতগুলো পাখির বাসা ভাঙা পড়েছে- তা তিনি জানেন না।
স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর জানাচ্ছে, রামনগর গ্রামে ১৫ থেকে ২০ প্রজাতির পাখির বিচরণ। প্রায় ৫০০ বড় গাছে এখন আনুমানিক দেড় থেকে দুই হাজার শামুকখোল পাখির বাসা আছে। এভাবে গাছ কাটায় পাখির পুরো কলোনিটি এখন হুমকির মুখে পড়েছে।
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘পরিবেশ প্রতিরক্ষা সংস্থার’ সভাপতি সোহাগ রায় সাগর বললেন, ‘এসব কলোনি রক্ষায় বন বিভাগকে বারবার আবেদন জানানো হলেও এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও ফলপ্রসূ কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। কর্মকর্তারা প্রায়ই কেবল পরিদর্শন করে চলে যান।’
সাগরের দাবি, বন্যপ্রাণী দ্বারা আক্রান্ত জানমালের ক্ষতিপূরণ বিধিমালা, ২০২১-এ সংশোধন এনে অবিলম্বে পাখি কলোনিতে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সুনির্দিষ্ট বিধি যুক্ত করতে হবে। ব্যক্তিগত মালিকানাধীন জায়গায় হলেও পাখি কলোনি রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে সঠিক ও বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাদেশ বায়োডাইভারসিটি কনজারভেশন ফেডারেশনের (বিবিসিএফ) সাধারণ সম্পাদক আরাফাত রহমান জানালেন, বন্যপ্রাণী ও বন আইনে পাখি কলোনির জন্য জমির মালিককে সুনির্দিষ্ট ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কোনো বিধি নেই। তবে বন্যপ্রাণী বা পাখি থাকা অবস্থায় কোনো গাছ কাটা হলে পাখির আবাসস্থল ও পাখি হত্যার অভিযোগে ‘বন্যপ্রাণী আইন -২০২৬’ অনুযায়ী শাস্তির বিধান আছে।
ঘটনাস্থল আজ পরিদর্শন করেছেন বগুড়ার সামাজিক বন বিভাগের উপ-বন সংরক্ষক মতলুবুর রহমান। এ ঘটনায় মামলা করতে স্থানীয় বন কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
মতলুবুর বললেন, ‘বন্যপ্রাণি সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন-২০২৬ অনুযায়ী শামুকখোল পাখির ছানা হত্যায় সহযোগিতার অভিযোগে জমির মালিককে আমরা অভিযুক্ত করতে পারি। জমির মালিক হিসেবে গাছ তার হতে পারে। কিন্তু পাখির ছানাকে মেরে ফেলার অধিকার তার নেই।’
‘এটা প্রতিষ্ঠিত কলোনি। তারা ২০ বছর ধরে গাছ রেখে দিতে পেরেছে, দুমাস পরেও গাছ কাটতে পারতো। তাহলে তো আর পাখির বাসাগুলো নষ্ট হতো না। এটা আমলযোগ্য অপরাধ। আমরা থানায় মামলা দিতে পারি, আবার সরাসরি আদালতেও মামলা হতে পারে’- যোগ করলেন এই কর্মকর্তা।







