লক্ষ্মীপুরের চরে চোরের তাণ্ডব, দিশেহারা মহিষ মালিকরা

লক্ষ্মীপুরের মেঘনার চর— সংগৃহীত
লক্ষ্মীপুরের মেঘনা নদীর দুর্গম চরাঞ্চলে প্রতিরাতেই গরু-মহিষ চুরি ও ডাকাতির ঘটনা ঘটছে। ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি, লক্ষ্মীপুর থেকে চুরি হওয়া গরু-মহিষ ভোলার চরাঞ্চলে নেওয়া হয়, আবার ভোলা থেকে চুরি হওয়া পশু আনা হয় লক্ষ্মীপুরের চরে। এভাবেই দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয়। চুরিতে বাধা দিতে গেলে মহিষ পালনকারীদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটছে। এতে তারা আর্থিকভাবে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। সীমান্তবর্তী চরাঞ্চল হওয়ায় ঘটনাস্থল নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়হীনতার অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, মেঘনা নদীতে জেগে ওঠা মেঘার চর ও রামমোহন চর কয়েকটি পরিবারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও তাদের অবস্থানের তেমন পরিবর্তন হয়নি। একই পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় চক্রটি ভাঙা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে চরাঞ্চলে চুরি-ডাকাতির ঘটনা অব্যাহত রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, গত শুক্রবার রাতে ভোলা থেকে পাঁচটি চোরাই মহিষ লক্ষ্মীপুরের মেঘার চরে এনে গিয়াস উদ্দিনের মহিষের বাথানের পাশে রেখে যায় চোর চক্র। সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত মহিষগুলো গিয়াস উদ্দিন তার মহিষের পালের সঙ্গে যুক্ত করেছেন বলে স্থানীয়দের দাবি।
এর আগে বুধবার ভোরে একই চরের কয়েকটি মহিষের বাথানে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত চোরের একটি দল হামলা চালায়। এতে শাহজাহান, জুয়েল, জহির, নবী, নিজাম, কাদির ও রুবেল আহত হন। তারা লক্ষ্মীপুর, ভোলা ও নোয়াখালীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা। পরে তাদের উদ্ধার করে লক্ষ্মীপুর ও ভোলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হামলার সময় কয়েকটি মহিষ, নগদ টাকা ও মোবাইল ফোন লুট করে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, মেঘনার চরাঞ্চলের একটি অংশ লক্ষ্মীপুর, একটি অংশ ভোলা এবং অপর অংশ বরিশাল জেলার আওতায় পড়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় ঘটনার অবস্থান নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে টানাপোড়েন দেখা যায়। লক্ষ্মীপুরের মজুচৌধুরীর হাট এলাকায় কোস্টগার্ডের কার্যালয় থাকলেও অভিযোগ রয়েছে, খবর পেয়েও তারা অনেক সময় অভিযানে যায় না। ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি, কোস্টগার্ডকে জানালে তারা বলে, ভোলায় তাদের মূল কার্যালয়। সেখান থেকে নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত তারা অভিযানে যেতে পারবেন না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তিনজন বাথান মালিক বলেছেন, ‘প্রায় প্রতিরাতেই কোনো না কোনো বাথানে চোরের দল হানা দেয়। লাখ লাখ টাকা মূল্যের গরু-মহিষ চুরি করে মালিকদের নিঃস্ব করে দিচ্ছে। তাদের দাবি, ভোলার বাসিন্দা রাসেল খা, মিন্টু খা, মামুন ও আরিফ আকন্দ এবং লক্ষ্মীপুরের শফি মাঝি, গিয়াস উদ্দিন, সালাহ উদ্দিন, সাদ্দাম হোসেন ও আবুল বাশার এ চক্রের সঙ্গে জড়িত। এর আগে ছৈয়াল গ্রুপ, সরকার গ্রুপ ও আলমগীর গ্রুপ নামে কয়েকটি চক্র সক্রিয় ছিল। এখনো নামে-বেনামে তাদের কার্যক্রম চলছে। তারা আরও বলেন, চোর ধরলেও পরে দলবেঁধে এসে বাথানে থাকা লোকজনের ওপর হামলা চালানো হয়। সম্প্রতি এমন কয়েকটি হামলার ঘটনাও ঘটেছে।
স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি চররমনী মোহন ইউনিয়নের তোফায়েল আহম্মদের বাথান থেকে প্রায় ১০ লাখ টাকা মূল্যের পাঁচটি মহিষ চুরি হয়েছে। প্রায় এক মাস আগে মেঘার চরের মতিন বেপারির ছয়টি মহিষ চুরি হয়, যার মূল্যও প্রায় ১০ লাখ টাকা। একই চর থেকে কৃষক শাহীন ও মজিব উল্যার একটি করে মহিষ চুরি হয়েছে। পাশাপাশি গরু চুরির ঘটনাও নিয়মিত ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
চররমনী মোহন ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক আবুল বাশার বলেছেন, ‘গত রাতে পাঁচটি চোরাই মহিষ সালাহ উদ্দিনের ঘরের পাশে কে বা কারা রেখে গেছে শুনেছি। পরে ওই মহিষগুলো সালাহ উদ্দিনরা তাদের মহিষের পালের সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে। আমার বিরুদ্ধে কেউ অভিযোগ দিয়ে থাকলে, তা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা।’
অভিযোগ রয়েছে, চররমনী মোহন ইউনিয়ন কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন ও তার ভাই চোরাই গরু-মহিষ কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও সাদ্দাম হোসেন ফোন রিসিভ করেননি।
অভিযোগ অস্বীকার করে রাসেল খা বলেন, ‘আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ আনা হচ্ছে। চুরি বা হামলার ঘটনায় আমি অথবা আমার সহযোগীদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।’
মোবাইল ফোনে বক্তব্য জানতে চাইলে লক্ষ্মীপুরের মজুচৌধুরীর হাট কোস্টগার্ড কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কন্টিনজেন্ট কমান্ডার নিজের নাম প্রকাশে রাজি হননি। তবে তিনি মন্তব্য করেন, ‘গরু-মহিষ চুরির ঘটনা আমাদের জানা নেই। ঘটনাটি নজরে আসেনি। নজরে আসলে অভিযান পরিচালনা করা হবে।’
লক্ষ্মীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) হোসাইন মোহাম্মদ রায়হান কাজেমী বলেছেন, ‘মহিষ চুরির ঘটনায় কেউ যদি লিখিত অভিযোগ দেয়, তাহলে আমরা তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেব। গত সপ্তাহেও এক চোরকে আটক করা হয়েছে। এছাড়া জমির বিরোধেও একজন আরেকজনের গরু-মহিষ নিয়ে যায়। এরপরও ঘটনাগুলো নিয়ে ভোলা ও বরিশাল পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হবে।’
ভোলা জেলা পুলিশ সুপার মো. শহিদুল্লাহ কাওছার বললেন, ‘চরে ভোলার অংশে হামলার বিষয়টি আমাদের জানা নেই। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’





