কুঁড়ি বিলে লাল শাপলার মেলা

লাল শাপলায় ভরে গেছে বকশীগঞ্জ উপজেলার বাট্টাজোড় ইউনিয়নের কুঁড়ি বিল। ছবি: আগামীর সময়
শরতের নীল আকাশ, মেঘের ভেলা আর সবুজের সমারোহের মধ্যে লাল শাপলার অপরূপ সৌন্দর্যে সেজেছে জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার বাট্টাজোড় ইউনিয়নের কুঁড়ি বিল। এর উত্তর দিকের অংশে প্রায় ১০০ একর জুড়ে ফুটে আছে অসংখ্য লাল শাপলা। দূর থেকে দেখলে সবুজের মধ্যে লাল ফুলের বিশাল গালিচার মতো দৃশ্য। এই সৌন্দর্যের টানে প্রতিদিনই ভিড় করছেন শত শত দর্শনার্থী।
কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে আবার কেউ নৌকায় চড়ে বিলের সৌন্দর্য উপভোগ করছেন। ভোরের কোমল আলো কিংবা বিকালের মিষ্টি রোদে লাল শাপলার সৌন্দর্য আরও মনোমুগ্ধকর হয়ে ওঠে।
বিলের পানিতে ভেসে থাকা পাতার ফাঁকে ফাঁকে ফুটে আছে অসংখ্য লাল শাপলা। চারপাশের সবুজ আর পানির ঢেউ মিলে তৈরি হয়েছে দৃষ্টিনন্দন পরিবেশ। নৌকার মাঝিরা ধীরে ধীরে বৈঠা চালিয়ে শাপলা সরিয়ে এগিয়ে যান। নৌকায় থাকা দর্শনার্থীরা মুগ্ধ চোখে উপভোগ করেন সেই দৃশ্য। অনেকে মোবাইল ফোনে ছবি ও ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করছেন।
স্থানীয় হাসিনা গাজী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক গোলাম মোস্তফা বলেছেন, শাপলা দেখতে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। পড়াশোনার ব্যস্ততার বাইরে প্রকৃতির কাছাকাছি এসে তারা নির্মল আনন্দ উপভোগ করছে। অনেকে বন্ধুদের সঙ্গে দলবেঁধে নৌকায় ঘুরছে, তুলছে ছবি।
গারো পাহাড়ের পাদদেশঘেঁষা প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে এমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য স্থানীয়দের মধ্যেও নতুন আগ্রহ তৈরি করেছে। একসময় সাধারণ মানুষের পরিচিত একটি বিল হলেও এবার লাল শাপলার সমারোহে এটি প্রকৃতিপ্রেমীদের আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আলী মজনু বাবু জানালেন, বাট্টাজোড় ইউনিয়নের কয়েক হাজার একর জমি নিয়ে বিস্তৃত ঐতিহ্যবাহী কুঁড়ি বিল একসময় পদ্ম, শাপলা ও নানা জলজ উদ্ভিদের বড় প্রাকৃতিক আবাসস্থল ছিল। বর্ষায় বিলের বিস্তীর্ণ জলরাশি পদ্মপাতা ও বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদে ভরে উঠত। বিলের সৌন্দর্য দেখতে তখন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসতেন।
তবে সময়ের সঙ্গে বিলের বিভিন্ন অংশে মাছের প্রকল্প গড়ে ওঠায় বদলে গেছে এর প্রাকৃতিক চেহারা। কমেছে জলজ উদ্ভিদের বিস্তার। হারিয়ে যাচ্ছে বিলের পুরনো ঐতিহ্য ও স্বাভাবিক জলাভূমির পরিবেশ। এর মধ্যেই উত্তরাংশে নতুন করে ফুটে ওঠা লাল শাপলা যেন সেই হারানো সৌন্দর্যের কিছুটা ফিরিয়ে দিয়েছে।
শাপলা দেখতে আসা মানুষের ভিড়কে কেন্দ্র করে স্থানীয় অর্থনীতিতেও প্রাণ ফিরেছে। দর্শনার্থীদের জন্য গড়ে উঠেছে কয়েকটি চায়ের দোকান, ফুচকার দোকান, কফি হাউসসহ বিভিন্ন ছোটখাটো খাবারের দোকান। শিশুদের বিনোদনের জন্যও রয়েছে নানা আয়োজন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী আলী জানিয়েছেন, প্রতিদিন দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়ায় তাদের ব্যবসাও জমে উঠেছে। অস্থায়ী দোকান ও ছোট ব্যবসার মাধ্যমে প্রত্যন্ত এলাকার কিছু মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানালেন, পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে কুঁড়ি বিলের এই শাপলা অঞ্চলটি বকশীগঞ্জের অন্যতম দর্শনীয় স্থানে পরিণত হতে পারে। এ জন্য নিরাপদ নৌযান, দর্শনার্থীদের বসার ব্যবস্থা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা ও পর্যাপ্ত স্যানিটেশন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব পর্যটন ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
অপরিকল্পিত স্থাপনা, ময়লা-আবর্জনা ও অতিরিক্ত মাছের প্রকল্পের কারণে বিলের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হতে পারে। তাই শাপলার সৌন্দর্য ধরে রাখতে জলাভূমির প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি পর্যটন ব্যবস্থাপনাও পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন তারা।
বাট্টাজোড় ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান লিটন আকন্দ বলেছেন, যথাযথ সংরক্ষণ ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কুঁড়ি বিলের এই শাপলা অঞ্চলকে নান্দনিক ও পরিবেশবান্ধব পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যাশা রয়েছে।




