শাপলার ডাঁটায় চার পরিবারের জীবিকা

শাপলার ডাঁটা তোলার মধ্যে দিয়ে দিনের শুরু তাদের
ভোর রাত ৪টা। চারদিকে অন্ধকার, নিস্তব্ধ বিল, শুধু দূরের পাখির ডাক। সূর্য ওঠেনি তখনো। সেই সময়েই গাজীপুরের কালীগঞ্জের বেলাই বিলে নেমে পড়েন চারজন মানুষ। হাতে কাঁচি, কুষা, কোমরসমান পানিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা শাপলার ডাঁটা তোলার মধ্য দিয়ে দিনের শুরু তাদের।
তাদের তোলা সেই ডাঁটাই পৌঁছে যায় ঢাকার বাজারে। আর সেই আয়েই চলে তাদের চারটি পরিবারের সংসার। প্রকৃতির সঙ্গে প্রতিদিনের এ লড়াই-ই তাদের জীবিকার একমাত্র ভরসা।
তারা হলেন— উপজেলার মোয়ানি গ্রামের বাসিন্দা মুক্তাজুল ইসলাম (৩০), আরিফ রাজ (২৪), ফারুখ মিয়া (৪৬) ও মিলন মিয়া (৪০)। প্রতিদিন নয়, একদিন পরপর ভোর বেলায় বিলে নামেন তারা। সকাল থেকে প্রায় দুপুর পর্যন্ত চলে এই কাজ।
সরেজমিনে দেখা যায়, ছোট নৌকা নিয়ে বিলের গভীরে গিয়ে শাপলার নিচে ডুবে থাকা ডাঁটা বিশেষ কৌশলে সংগ্রহ করছেন তারা। কখনো কোমরসমান, কখনো বুকসমান পানিতে দীর্ঘ সময় কাজ করতে হয়। পরে ডাঁটা পরিষ্কার করে বস্তাবন্দি করে পাঠানো হয় ঢাকার রায়েরবাজারে।
মুক্তাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, বৃদ্ধ মা ও তিন সন্তান নিয়ে তার সংসার। শাপলার মৌসুমে যে আয় হয়, তা দিয়েই বছরের বড় একটি সময় পরিবারের খরচ মেটাতে হয়। শাপলার ডাঁটার বাজার ভালো থাকলে একবার বিক্রি করে প্রায় ২৪ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হয়। পরিবহন খরচ বাবদ প্রায় ৪ হাজার টাকা এবং বিক্রির স্থান ভাড়া হিসেবে আরও ১ হাজার টাকা ব্যয় হয়। বাকি অর্থ সমানভাবে ভাগ করে নেন চারজন।
আরিফ রাজ বলেছেন, শাপলার ডাঁটা সংগ্রহকে সহজ কাজ মনে করেন অনেকেই; কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানিতে দাঁড়িয়ে কাজ করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। বর্ষায় পানির স্রোত ও গভীরতা বাড়ে, আর শীতকালে ঠান্ডা পানিতে দীর্ঘ সময় কাজ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
ফারুখ মিয়া বলেছেন, ‘আমাদের কোনো নির্দিষ্ট মাসিক আয় নেই। শাপলার মৌসুমে যতটুকু আয় হয়, তা দিয়েই সংসার চালানোর চেষ্টা করি। কাজটা কষ্টের হলেও অভাবের কারণে ছাড়তে পারি না।
মিলন মিয়া জানিয়েছেন, দুপুর পর্যন্ত বিলে কাজ করার পরও দায়িত্ব শেষ হয় না। এরপর শাপলার ডাঁটা বাছাই, পরিষ্কার এবং বাজারে পাঠানোর কাজ করতে হয়। দিন শেষে শরীর আর সাড়া দেয় না।
স্থানীয়দের মতে, বেলাই বিল শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই নয়, বহু নিম্নআয়ের মানুষের জীবিকারও অন্যতম উৎস। বর্ষা মৌসুমে এখানকার শাপলার ডাঁটার চাহিদা রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে থাকে।
স্থানীয় প্রবীণরা বলেছেন, একসময় বেলাই বিলের আশপাশের শত শত পরিবার মাছ ধরা, শাপলা সংগ্রহ ও অন্যান্য জলজ সম্পদের ওপর নির্ভরশীল ছিল। সময়ের সঙ্গে সেই সংখ্যা কমলেও এখনো অনেক পরিবারের জীবিকা এই বিলকে ঘিরেই।
প্রতিদিন ভোরের অন্ধকারে শুরু হওয়া এই শ্রম শুধু একটি সবজি বাজারে পৌঁছে দেয় না, বরং চারটি পরিবারের বেঁচে থাকার গল্পও বহন করে। বেলাই বিল তাই শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যের নয়, সংগ্রাম আর জীবিকারও এক অনন্য ঠিকানা।





