‘এই সাইকেলই আমার মা লক্ষ্মী’

দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে রঘুনাথ ঠাকুর
সাপাহার শহরের অলিতে-গলিতে যখন রাত গভীর হয়, ঘড়ির কাঁটা ১১ ছুঁইছুঁই— তখন ক্লান্তি ঝেড়ে এক প্রবীণ মানুষ প্যাডেলের ওপর ভর দিয়ে বাড়ির পথ ধরেন। বয়স ৬০ ছুঁইছুঁই, দুর্বল হয়ে যাওয়া শরীর, তবুও মুখে লেগেই থাকে এক অমলিন প্রাপ্তির হাসি। গত দুই দশক ধরে এই দৃশ্যটাই এই শহরের সবচেয়ে পরিচিত এক গল্প। এই মানুষটির নাম রঘুনাথ ঠাকুর। ভালোবেসে সবাই ডাকেন ‘ঠাকুরদা’।
সাপাহার পালপাড়ার এই বাসিন্দার কাছে তার জং ধরা পুরনো বাইসাইকেলটি শুধু একটি বাহন নয়, জীবিকার চাকা গড়িয়ে বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বনও।
জীবনের চাকা আর চিকিৎসার টানাপড়েন
রঘুনাথের জীবনের গল্পটা শুধু ঘাম ঝরানোর নয়, এটি দায়িত্ব আর ভালোবাসার এক নীরব লড়াই। বাড়িতে তার স্ত্রী অনিতা দেবী দীর্ঘদিন ধরে ভুগছেন জটিল হরমোনজনিত রোগে। প্রতি মাসে স্ত্রীর ওষুধ কিনতে প্রয়োজন হয় প্রায় ৭ হাজার টাকা। অন্যদিকে সংসারের ছোট ছেলে পড়ছে দশম শ্রেণিতে, যার পড়াশোনার খরচ জোগাতে রীতিমতো হিমসিম খান রঘু।
সংসারের ঘানি টানতে রঘুনাথের সম্বল বলতে শুধু একটি বাইসাইকেল। সকালে ঘুম থেকে জেগে বাড়িতে তৈরি মুচমুচে পেঁয়াজু, গরম সিঙারা, চা-বিস্কুট আর চিপস সাজিয়ে নেন সাইকেলের ক্যারিয়ারে। এরপর সকাল সকাল বেরিয়ে পড়েন জীবিকার অন্বেষণে।
‘এভাবেই যেন চলতে চলতেই ওপারে যেতে পারি’
বয়সের ভারে হাড়গোড় যখন আর আগের মতো সায় দেয় না, তখনো থেমে থাকে না রঘুনাথের প্যাডেল। একটু ভালো থাকার আশায় কিংবা পরিবারের মুখে দুমুঠো ভাত তুলে দেওয়ার তাগিদে প্রতিদিন বাইসাইকেলটি নিয়ে বেরিয়ে পড়েন তিনি।
চোখেমুখে কোনো অভিযোগ নেই, নেই কোনো ক্ষোভ। পরম মমতায় নিজের পুরনো বাহনটির দিকে তাকিয়ে রঘুনাথ বলেন, এ সাইকেলই আমার মা লক্ষ্মী। ও আছে বলেই আজ আমার সংসার চলছে, স্ত্রীর ওষুধ কেনার পয়সা জোটে।
জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও কোনো প্রাপ্তির লোভ নেই তার। বুকভরা আশা নিয়ে তিনি শুধু একটাই প্রার্থনা করেন— এভাবেই যেন চাকা সচল রেখেই একদিন ওপারে যেতে পারি, আপনারা আশীর্বাদ করবেন।




