তালপাতায় দোয়াত-কালিতে হাতেখড়ির পাঠশালা

বাগেরহাটের চিতলমারীতে তালপাতায় লেখা শিখাচ্ছেন পণ্ডিত কালিপদ বিশ্বাস। ছবি: আগামীর সময়
ফ্লোরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে তালপাতা। শিশুদের কিচিরমিচির ঘর জুড়ে। এক হাতে বাঁশের কঞ্চি, আরেক হাতে তালপাতা। দোয়াতের কালিতে কঞ্চি ডুবিয়ে পাতায় বর্ণমালা লেখা শিখছে তারা।
এ দৃশ্য হাজার বছর আগের নয়, এই সময়ের। স্লেট-চক, ব্ল্যাকবোর্ড পেরিয়ে বর্ণমালার হাতেখড়ির মাধ্যম যখন নানা ডিভাইস, তখন এমন তালপাতার পাঠশালা চলছে বাগেরহাটে।
ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে চিতলমারী উপজেলার দক্ষিণ ডুমুরিয়া গ্রামে ২০০৫ সালে চালু হয় ‘শিশু শিক্ষা নিকেতন’। ২২ বছর ধরে এলাকার শিশুরা এখানে তালপাতায় শিখছে বর্ণমালা। শিক্ষক ৮০ বছরের পণ্ডিত কালিপদ বিশ্বাস।
ডিভাইসের যুগে তালপাতা কেন? এর উত্তর মিলল এখানকার শিক্ষার্থী আর অভিভাবকদের কথায়।
ছোট্ট ছাত্রী লক্ষ্মী মজুমদার বলল, ‘তালপাতায় লিখলে ভুল করলে সহজে মোছা যায় না। তাই মনোযোগ দিয়ে লিখতে হয়। এভাবে লেখার অভ্যাসও ভালো হয়।’
অভিভাবক শ্যামলী রানীর মতে, মোবাইল আর টেলিভিশনের কারণে আজকাল শিশুরা পড়াশোনায় মনোযোগ দ্রুত হারিয়ে ফেলে। এই পাঠশালায় নিয়মের মধ্যে থেকে লেখা শেখানো হয়। তালপাতায় লিখতে হয় খুব মন দিয়ে। এভাবে একাগ্রতা বাড়ে।
এই স্কুল থেকে শিক্ষাজীবন শুরু হয় সাগর বিশ্বাসের। এখন পড়েন বাগেরহাট শহরের পিসি কলেজে। তার কথা, ‘তালপাতায় লেখার অভ্যাসে আমার হাতের লেখা সুন্দর হয়েছে। পাশাপাশি এখানকার শৃঙ্খলা ও নৈতিক শিক্ষাও আমার অনেক উপকার করেছে।’
নিজ বাড়িতে তিন শিশু নিয়ে পাঠশালা চালু করেছিলেন পণ্ডিত কালিপদ। শিক্ষার্থী বাড়তে থাকলে গ্রামের এক ব্যক্তি স্কুলঘর তৈরির জন্য তাকে দিয়ে দেন এক টুকরো জমি। সেখানে এক কক্ষের ছোট্ট স্কুলে এখন শিক্ষার্থী ৫০ জন। নিয়মিত শেখানো হয় স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণ, বানান ও শতকিয়া।
খুদে হাত তুলে নেয় বাঁশের কলম, দোয়াত আর তালপাতা। পাশে বসে হাত ধরে লেখা শিখিয়ে দেন পণ্ডিত। শিশুদের সঙ্গে প্রতিদিন স্কুলে আসেন মায়েরাও। কেউ বসে তালপাতা রোদে শুকান, কেউ বাঁশের কঞ্চি কেটে কলম তৈরিতে ব্যস্ত।
‘তালপাতায় লেখার ফলে শিশুদের হাতের লেখা সুন্দর হয় এবং তারা নিয়মিত চর্চার মধ্যে থাকে’— বলছিলেন পণ্ডিত কালিপদ।
তিনি জানালেন, স্বরবর্ণ-ব্যঞ্জনবর্ণ শেখাতে মাসে নেওয়া হয় ১৫০ টাকা। বানান ও শতকিয়ার জন্য নেওয়া হয় ২০০ টাকা করে। এই অর্থে চলে পাঠশালার প্রয়োজনীয় খরচপাতি।
কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এই পাঠশালা এলাকার ঐতিহ্যের অংশ বলে মনে করেন স্থানীয় সমাজসেবক গৌরাঙ্গ মণ্ডল। ‘কালিপদ স্যার অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে শিশুদের শিক্ষা দেন। তিনি প্রতিটি শিশুর হাতে ধরে ধরে লেখা শেখান। তাই আমরা সন্তানদের এখানে পাঠাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি’— বললেন তিনি।
‘শিশু শিক্ষা নিকেতনে’ আছে নানা সীমাবদ্ধতাও। ‘গরমের সময় বিদ্যুতের অভাবে শিশুদের কষ্ট হয়। আবার বর্ষা ও জোয়ারের সময় হাঁটুপানি কাদা পেরিয়ে বাড়ি ফিরতে হয়’— বলছিলেন অভিভাবক অংকিতা রানী। তার সুরে অন্য অভিভাবকরা জানালেন অবকাঠামোগত সমস্যার কথাও।
তারপরও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপদ্ধতি সংরক্ষণে একজোট এলাকাবাসী। সংকট সমাধানে তাদের প্রত্যাশা— প্রশাসনের নজর আর সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা।
‘দক্ষিণ ডুমুরিয়ার এই পাঠশালা আমাদের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা-সংস্কৃতির এক অনন্য নিদর্শন। এর উন্নয়ন ও সংরক্ষণে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে’— আশ্বাস বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেনের।









