বড় সরদার বাড়ির ক্ষয়ক্ষতি তদন্তে বিচার বিভাগীয় কমিশন চেয়ে স্মারকলিপি

নারায়ণগঞ্জের বড় সরদার বাড়ি
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে প্রায় ৫০০ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক বড় সরদার বাড়ির সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি তদন্তে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের প্রশাসনিক ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও তদন্তের দাবি করা হয়েছে।
এসব দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে ‘সোনারগাঁয়ের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ কমিটি’।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) পাঠানো স্মারকলিপিতে বড় সরদার বাড়ির পূর্ণাঙ্গ কারিগরি পরীক্ষা, বাণিজ্যিক শুটিংয়ের নথি প্রকাশ, ফাউন্ডেশনের আর্থিক কার্যক্রমের স্বাধীন নিরীক্ষা এবং প্রকৃত কারুশিল্পীদের অধিকার সুরক্ষাসহ ১২ দফা দাবি জানানো হয়।
স্মারকলিপিতে বলা হয়, ঐতিহাসিক বড় সরদার বাড়িতে টানা চার দিন বাণিজ্যিক শুটিং হয়েছে। এতে উচ্চক্ষমতার জেনারেটর, ভারী ক্যামেরা, সাউন্ড সিস্টেম, ক্যামেরা ক্রেন, ট্রলি ও শক্তিশালী আলোকসজ্জার সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়। এসব সরঞ্জাম ব্যবহারের কারণে স্থাপনাটির পুরোনো গাঁথুনি, চুনসুরকি, কাঠ, প্লাস্টার, মেঝে ও অলংকরণে কোনো ক্ষতি হয়েছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছে কমিটি।
এ জন্য প্রত্নতত্ত্ববিদ, সংরক্ষণ স্থপতি ও কাঠামো প্রকৌশলীদের সমন্বয়ে স্বাধীন বিশেষজ্ঞ দল গঠনের দাবি করা হয়েছে। শুটিংয়ের আগে হেরিটেজ ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট করা হয়েছিল কি না, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া হয়েছিল কি না এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখার দাবি জানানো হয়।
এদিকে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের প্রশাসনিক ও আর্থিক কার্যক্রম নিয়েও বিভিন্ন অভিযোগ তুলেছে কমিটি।
স্মারকলিপিতে বলা হয়, প্রকৃত কারুশিল্পীদের বঞ্চিত করে সুবিধাজনক স্থানে অকারুশিল্পীদের দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া দোকান বরাদ্দের ক্ষেত্রে আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত নগদ অর্থ নেওয়ার অভিযোগও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে।
ফাউন্ডেশনের সুবর্ণজয়ন্তী ও বাংলা নববর্ষ ১৪৩২ উদযাপন, নির্মাণ ও মেরামতকাজ, শ্রমিক বিল, স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ, কারুশিল্পীদের কাঁচামাল কেনা এবং সরকারি অর্থ বেসরকারি ব্যাংকে রাখাসহ বিভিন্ন আর্থিক কর্মকাণ্ডে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও তদন্তের দাবি জানিয়েছে কমিটি।
অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে কার্যাদেশ, টেন্ডার ও কোটেশন, পরিমাপ বই, বিল-ভাউচার, ব্যাংক হিসাব, শ্রমিক হাজিরা, অর্থ পরিশোধের রেকর্ড, দোকান বরাদ্দের তালিকা এবং ট্রাস্টি বোর্ডের সিদ্ধান্তসহ সংশ্লিষ্ট নথি পরীক্ষা করার আবেদন জানানো হয়েছে। তদন্ত চলাকালে এসব নথি পরিবর্তন, সরিয়ে ফেলা বা নষ্ট করা ঠেকাতে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি করা হয়।
স্মারকলিপিতে আরও বলা হয়, কারুপল্লীতে অনেক প্রকৃত কারুশিল্পীর দোকান এমন স্থানে রয়েছে, যেখানে দর্শনার্থীদের সহজে যাতায়াতের সুযোগ নেই। অন্যদিকে সুবিধাজনক স্থানে অকারুশিল্পীদের দোকান বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ অবস্থায় প্রকৃত কারুশিল্পীদের অগ্রাধিকার এবং কারুশিল্পী পরিচয় যাচাইয়ের স্বচ্ছ পদ্ধতি চালুর দাবি জানানো হয়েছে।
১২ দফা দাবির মধ্যে ঐতিহাসিক স্থাপনায় বাণিজ্যিক শুটিং ও বড় আয়োজনের আগে হেরিটেজ ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট বাধ্যতামূলক করা, ঐতিহাসিক স্থাপনার বাণিজ্যিক ব্যবহারে পৃথক নীতিমালা প্রণয়ন, দোকান বরাদ্দের পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ, তদন্তে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তদন্ত কমিশন ও কারিগরি বিশেষজ্ঞ দলের প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশের দাবিও রয়েছে।
এর আগে একই অভিযোগে গত ২৯ আগস্ট নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে সংরক্ষণ কমিটি। পরে ৩১ আগস্ট সোনারগাঁয়ে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়।
কমিটির আহ্বায়ক শাহেদ কায়েস বলেছেন, ‘তদন্তের আগে কোনো অভিযোগকে আমরা চূড়ান্ত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করছি না। স্বাধীন তদন্ত ও বিশেষজ্ঞ পরীক্ষার মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণ এবং বড় সরদার বাড়িসহ সোনারগাঁয়ের ঐতিহাসিক সম্পদ ও প্রকৃত কারুশিল্পীদের স্বার্থ সুরক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আবেদন জানিয়েছি।’



