সাগরে জাল ফেললেই লোকসান

ছবি: আগামীর সময়
৯ দিন সাগরে ছিলেন। জালে উঠেছে হাজারখানেক ছোট-মাঝারি ইলিশ। সঙ্গে আরও কিছু মাছ। সব মিলিয়ে মাছ বিক্রি করে পেয়েছেন ৪ লাখ টাকা। শুনতে অঙ্কটা বড় মনে হলেও পুরোটাই ‘জলছবি’। জেলেদের মজুরি, জ্বালানি, খাবার, বরফ ও ট্রলারের অন্যান্য খরচ মেটাতেই পুরোটা শেষ। লাভের খাতায় যোগ হয়নি এক টাকাও। মহেশখালীর কুতুবজোমের এনাম মাঝির কাছে তাই সাগরে মাছ ধরা এখন ‘লস প্রজেক্ট’।
চলতি বছর জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা শেষ হয়। এরপর ১৩ জন জেলে নিয়ে ‘এফবি আল্লাহর দান’ ট্রলারে সাগরে নামেন এনাম মাঝি। আগামীর সময়ের সঙ্গে কথোপকথনে তিনি জানালেন, প্রথম মাসে কিছুটা লাভের মুখ দেখলেও পরের দুই মাস ধরে লোকসান গুনছেন। মাছ ধরা ছাড়া অন্য কোনো কাজ না জানায় লোকসান হলেও সাগরে যেতে হয় তাকে। ব্যর্থতার দায় মেনে নিয়ে এক ট্রলারের কাজ ছেড়ে আরেক ট্রলারে উঠে জীবিকার সন্ধান করতে হয়।
এনাম মাঝির মতো একই অভিজ্ঞতা পেকুয়ার রাজাখালী ইউনিয়নের ট্রলার মালিক মোহাম্মদ ইদ্রিসের। তার ‘এফবি আবরার’ ও ‘আল্লাহর দান’ নামে দুটি ট্রলার রয়েছে। ট্রলার সাগরে পাঠিয়ে কূলে বসে উৎকণ্ঠায় থাকতে হয় তাকে। কারণ, সাগরে মাছ পাওয়ার খবর এবার খুব একটা নেই।
ইদ্রিসের ভাষ্য, মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার পর বৈরী আবহাওয়ার কারণে সাগরে মাছও কম পাওয়া যাচ্ছে। এ মৌসুমে তুলনামূলক ছোট আকারের ‘আল্লাহর দান’ ট্রলারটি সাগরে নামাননি।
এফবি ইমরানুল জামান ট্রলারের মাঝি পেটান ৪০ বছর ধরে সাগরে মাছ ধরছেন। ১৪ দিনের ট্রিপে বরিশাল উপকূল ঘুরে এসেও ট্রলারের খরচ তুলতে পারেননি। তার কথা, সাগরে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রলিং (বড় ফিশিং ট্রলার) ও ভারতের ট্রলারের কারণে মাছের দেখা পাওয়া মুশকিল। চলতি মৌসুমের তিন মাসের মধ্যে দুই মাস ধরে তার ট্রলারও লোকসানে চলছে। ফলে ঠিকমতো পারিশ্রমিক পাচ্ছেন না তারা।
কক্সবাজার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সর্বোচ্চ অবতরণ হয় ২০১৯-২০ অর্থবছরে, ১১ হাজার ১৭ টন। এরপর থেকেই নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যায়। সর্বোচ্চ অবতরণের বছর ২০১৯-২০ এর সঙ্গে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৬ হাজার ২১১ টন তুলনা করলে ৪ হাজার ৮০৬ টন বা ৪৩ দশমিক ৬২ শতাংশ মাছ অবতরণ কমেছে।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান বলেছেন, বর্ষাকালে লঘুচাপ, নিম্নচাপ বা গভীর নিম্নচাপের প্রভাবে উপকূলীয় এলাকায় তীব্র বাতাস, বৃষ্টিপাত ও সাগর উত্তাল হয়ে ওঠে। এ কারণে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত দেওয়া হয়। তার ভাষ্য, ৩ নম্বর সংকেত দেওয়া হলে মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারগুলোকে দ্রুত উপকূলের কাছাকাছি নিরাপদ স্থানে চলে আসতে হয়।
জেলেদের পরিকল্পনা থাকে সাধারণত ৭ থেকে ২১ দিন সাগরে থাকার। কিন্তু বাস্তবে অনেক ট্রলারকে দুই-তিন দিনের মধ্যেই ফিরতে হচ্ছে। একেকটি ট্রিপে সাড়ে ৩ থেকে সাড়ে ৯ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হলেও মাছ উঠছে কখনো ২০ হাজার, কখনো ১ লাখ টাকার। এফবি আল্লাহ মালিক ট্রলারের জেলে আমিনুল ইসলাম বললেন, ‘আমরা ১০ দিনের জন্য সাগরে মাছ ধরতে গিয়েছিলাম। কিন্তু আবহাওয়া খারাপ হয়ে যাওয়ায় মাত্র তিন দিনের মাথায় ফিরে আসতে হয়েছে। মালিক ৪ লাখ টাকা খরচ করে ট্রলার পাঠিয়েছেন, কিন্তু আমরা মাত্র ৫০টি মাছ নিয়ে ফিরেছি।’
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট কক্সবাজার সামুদ্রিক কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ আশরাফুল হক বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৈশ্বিক তাপমাত্রাসহ নানা ধরনের দূষণ বাড়ছে। পাশাপাশি লবণাক্ততা ও সাগরে দূষণও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্লাস্টিক দূষণের কারণে মাছের প্রজনন কমে যাচ্ছে। তার ভাষ্য, সাগরে প্লাস্টিকসহ নানা ধরনের দূষণে মাছ, কাঁকড়া ও চিংড়ির জন্য ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। কিছু জালের ব্যবহার ডিম-পোনা ও মাছ নিধনে ভূমিকা রাখছে।
জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারে এ খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত মানুষের সংখ্যা দেড় লাখের বেশি।
কক্সবাজার ফিশিং বোট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, ৪০ থেকে ৬০ ফুট দীর্ঘ কাঠের ট্রলারগুলো গভীর সমুদ্রে যায়। এসব ট্রলারে সাধারণত ১৪০ থেকে ২৯০ হর্সপাওয়ারের ইঞ্জিন থাকে। বড় একটি ট্রলারে ২০-৩০ এবং মাঝারি ট্রলারে ১৫-২২ জন পর্যন্ত জেলে থাকেন। তিনি জানালেন, সামনে মা ইলিশ সংরক্ষণ মৌসুমের ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা। প্রধান প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশকে নিরাপদে ডিম ছাড়ার সুযোগ দিতে প্রতি বছর এ নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। আশ্বিন মাসের পূর্ণিমাকে ভিত্তি করে নির্ধারিত সময় সাধারণত অক্টোবরের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহে শুরু হয়।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা মন্তব্য করেছেন, নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর সাগরে নেমে কাঙ্ক্ষিত মাছ না পাওয়ার পর আবার নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে যাচ্ছেন জেলেরা। জাল ফেলে যদি মাছ না ওঠে, তাহলে সাগর আর জীবিকার জায়গা থাকে না, শুধু লোকসানের হয়ে যায়।



