খুলনা নগরী
ব্যয় ৬৫৪ কোটি, তবুও জলাবদ্ধতায় দুর্ভোগ
- পুনঃখনন হয়েছে চার নদ ও খাল
- পুননির্মাণ হয়েছে ১৬৯টি ড্রেন ও ছয়টি স্লইসগেট
- বিভিন্ন সড়ক উঁচু করা হয়েছে
- ১৬৯ কোটি ব্যয়ে চলছে ১৪টি ড্রেন ও পাম্পহাইজ নির্মাণ

ছবি: আগামীর সময়
মহানগরী খুলনার জলাবদ্ধতা নিরসনে বিগত আট বছরে ব্যয় হয়েছে ৬৫৪ কোটি টাকা। এ সময় পুনঃখনন করা হয়েছে চারটি নদ ও খাল। পুননির্মাণ হয়েছে ১৬৯টি ড্রেন ও ছয়টি স্লইসগেট, উঁচু করা হয়েছে বিভিন্ন সড়কও। কিন্তু বিপুল অঙ্কের টাকা ব্যয়ে এত কাজ করার পরও ফলাফল শূন্য।
কয়েক ঘণ্টার টানা বৃষ্টিতেই নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, বাড়ি-ঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েন নগরবাসী।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, খুলনায় গত বুধবার সকাল ৬টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় ৭৮ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। পরের দিন বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা থেকে শুক্রবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ৮৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। শুক্রবার আরও ৪৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।
এই বৃষ্টিপাতেই বৃহস্পতি ও আজ শুক্রবার সকালে নগরীর টুটপাড়া, রয়েল মোড়, গোবরচাকা, মিস্ত্রিপাড়া, আহসান আহমেদ রোড, বাস্তুহারা, চানমারী, লবণচরা, নতুন বাজারসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে অনেক সড়ক পানিতে তলিয়ে থাকতে দেখা গেছে। তবে এরমধ্যে মুজগুন্নী, বাস্তুহারা, নেভি স্কুল এলাকার অবস্থা ছিল সবচেয়ে শোচনীয়। সেখানে বাসাবাড়ি, দোকানপাটে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন বাসিন্দারা।
করপোরেশনের তথ্য অনুসারে, জলাবদ্ধতা নিরসনে স্থায়ী ব্যবস্থা নিতে ২০১৮ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর একনেকে অনুমোদন দেওয়া হয় খুলনা শহরের জলাবদ্ধতা দূরীকরণে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রকল্প। এর মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৮২৩ কোটি টাকা। মেয়াদ রয়েছে ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। গত আট বছরে প্রকল্পে আওতায় প্রায় ৬৫৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ময়ূর নদ, ক্ষুদের খাল, নারকেল বাড়িয়া ও হরিণটানাখাল খাল পুনঃখনন করা হয়েছে। ১৬৯টি ড্রেন পুননির্মাণ এবং ছয়টি স্লইসগেট নির্মাণকাজ শেষ করা হয়েছে। বর্তমানে ১৬৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৪টি ড্রেন এবং ৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ে পাম্পহাইজ নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, এত বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও বাস্তবে জলাবদ্ধতা পরিস্থির তেমন সুফল মেলেনি। এখনও একটু ভারী বৃষ্টিতে তলিয়ে যাচ্ছে নগরীর নিম্নাঞ্চল। সড়ক, অলিগলি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বাড়িঘর পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কার্যত স্থবির হয়ে পড়ছে জনজীবন। তীব্র জলজটে অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, রিকশা ও ইজিবাইকচালক সবাই চরম দুর্ভোগে পড়ছেন।
বৃষ্টিতে হাঁটু পানিতে নিমজ্জিত হয় উত্তর মুজগুন্নী ঈদগাহ সড়ক। পানিতে ডুবেছে সড়কটির পাশের বাসিন্দা শামীম শিকদারের বাড়ির চারপাশ। শুক্রবার সকালে শামীম শিকদার জানিয়েছেন, হাঁটু মাড়িয়ে ঘরে যেতে হচ্ছে। মাত্র সামান্য একটু পানি বাড়লেই তার ঘরের মধ্যে ঢুকে যাবে। শুধু আমার বাড়ি না, মুজগুন্নী আবাসিকে নিচু বাড়িগুলোর নিচ তলায় পানি ঢুকে গেছে। ফলে আসববপত্র নষ্ট হচ্ছে, নিচতলায় বসবাস করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
মুজগুন্নী আবাসিক ২১ নম্বর রোডের বাসিন্দা মিঞ্জু ইসলাম জানিয়েছেন, তাদের চারতলা ভবনের নিচতলায় পানি উঠেছে। ফলে নিচতলা ভাড়াটিয়ারা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। বাসা ছেড়ে দেওয়া কথা জানিয়েছেন তারা।
বাস্তুহারা কাঁচাবাজার ব্যবসায়ী আব্দুর রব জানিয়েছে, একটু ভারী বৃষ্টি হলেই বাজার ডুবে যায়। ফলে বাজারের ব্যবসায়ীদের নানা রকমের দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে।
মহানগরীর বাসিন্দারা অভিযোগ করে বলেছেন, করপোরেশন সড়ক ড্রেন গুলো উঁচু করে নির্মাণ করেছে। এ কারণে আশপাশের সড়ক ও ড্রেনের তুলনায় বাড়ি নিচু হয়ে পড়েছে। ফলে বৃষ্টির পানি একবার বাড়ির ভেতরে ঢুকলে তা সহজে বের হতে পারে না। অনেক এলাকায় সড়ক থেকে পানি নেমে গেলেও বাড়ির আঙিনা ও নিচতলা ঘণ্টার পর ঘণ্টা, কখনও কয়েক দিন পর্যন্ত পানির জমে থাকে।
টুটপাড়া এলাকার ইজিবাইকচালক জিয়াউল আলম বলেছেন, পেটের দায়ে সারারাত বৃষ্টির পরও রাস্তায় নামতে হয়েছে। বিভিন্ন সড়কে পানি জমে থাকায় ঝুঁকি নিয়ে ইজিবাইক চালাতে হয়েছে। ব্যাটারিতে পানি ঢুকে গেলে গাড়ি নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
জলাবদ্ধতা দূরীকরণে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক শেখ মোহাম্মদ মাসুদ করিম ও করপোরেশনের প্লানিং কর্মকর্তা আবির উল জব্বার বলেছেন, অনেক ড্রেন পরিষ্কার নেই, সড়ক থেকে ড্রেনে পানি যাওয়ার ছিদ্রও বন্ধ হয়ে গেছে, কিছু স্লুইসগেট অকার্যকর হয়ে গেছে, খাল নদ ও খাল আবারও ভরাট হয়ে গেছে, নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে গেছে, নদীতে জোয়ার থাকলে পানি নামে না-এসব কারণে জলজট ও জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে।
তবে জলাবদ্ধতার সমাধানে ৬৫৪ কোটি টাকার কাজ সমাপ্ত হলেও পাম্প বসানোসহ চলমান রয়েছে ১৬৯ কোটি টাকার কাজ। এ ছাড়া আরো ৪০০ কোটি টাকা কাজ শিগগির শুরু হবে। এসব কাজ শেষ হলে জলাবদ্ধতার সমস্যা নিরসমন হবে, জানালেন এইম কর্মকর্তা।






