জলাবন হারাচ্ছে জীববৈচিত্র্য
- বন উজাড়, মাছ শিকার ও পাখি নিধন

একসময় হিজল-করজের ছায়ায় পাখির ডাকে মুখর থাকত হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার লক্ষ্মী বাঁওড় জলাবন। শীত এলে ভিড় জমত পরিযায়ী পাখির। জলাশয়ে ছিল মাছ, বিচরণ করত বন্যপ্রাণী। সেই জলাবন এখন ধীরে ধীরে হারাচ্ছে তার প্রাণ ও বৈচিত্র্য। নির্বিচারে গাছ কাটা, অপরিকল্পিত মাছ শিকার ও পাখি নিধনে হুমকির মুখে পড়েছে প্রায় ৩৭৫ একর জুড়ে বিস্তৃত এই প্রাকৃতিক বন। পর্যটনের সম্ভাবনাময় এই জলাবন রক্ষায় কার্যকর নজরদারির ঘাটতি নিয়েও রয়েছে স্থানীয়দের অভিযোগ।
জলাবনের ভেতরে ছোট-বড় ২০টির বেশি জলাশয় রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব জলাশয় প্রতি বছর ইজারা দেওয়া হয়। মাছ শিকারের জন্য গাছের ডালপালা কেটে জলাশয়ে ফেলা হচ্ছে। কেউ কেউ জ্বালানি কাঠের জন্যও গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছে। এতে একদিকে গাছপালা কমছে, অন্যদিকে জলাবনের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।
বানিয়াচং উপজেলার বাসিন্দা মোবাশ্বির আহমেদ মজনুর ভাষ্য, ‘একসময় লক্ষ্মী বাঁওড় জলাবনে দখলদারিত্ব ছিল। বর্তমানে সেই পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন হলেও প্রশাসনের নজরদারি না থাকায় গাছ কাটা ও পাখি শিকার চলছে।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, ১৯৫৫ সালের পর থেকে সৈদরটুলা ছান্দ নামে একটি গোষ্ঠী জলাবনটির মালিকানা দাবি করে আসছে। এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ রয়েছে। মালিকানা নিয়ে বিরোধের পাশাপাশি জলাবনের ব্যবস্থাপনায়ও কার্যকর নজরদারির ঘাটতি রয়েছে।
পরিবেশবাদীরা বলছেন, জলাবনের উদ্ভিদ ও প্রাণবৈচিত্র্যও বেশ সমৃদ্ধ। হিজল, করজ, বরুণ, কাকুরা, খাগড়া, বাউলা ও নলসহ বিভিন্ন উদ্ভিদ রয়েছে এখানে। দোয়েল, পানকৌড়ি, বালিহাঁস, শালিক, ঘুঘু ও সাদা বকের পাশাপাশি শীতকালে দেখা মেলে পরিযায়ী পাখির। রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির সাপ, গুইসাপ ও বেজি। গাছপালা ও জলাশয়ের ওপর নির্ভরশীল এসব প্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ায় তাদের অস্তিত্বও পড়েছে ঝুঁকিতে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্যের কারণে লক্ষ্মী বাঁওড় জলাবন দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পর্যটকদের আকর্ষণ করে। তবে সংরক্ষণের উদ্যোগের অভাবে পর্যটনের এ সম্ভাবনাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। স্থানীয় এলআর সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাকির হোসেন মনে করেন, জলাবনটি সংরক্ষণে এখনই উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। তা না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম লক্ষ্মী বাঁওড়ের নাম শুধু শুনেই যাবে।
তবে জলাবনটির মালিকানা নিয়ে আইনি জটিলতা রয়েছে বলে জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। বানিয়াচং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মেহরাব হোসাইন বললেন, ‘লক্ষ্মী বাঁওড়ের ৩৭৫ একরের মধ্যে প্রায় ৭৫ একর সরকারি জমি, যা এক জায়গায় নয়, বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে আছে। বাকি প্রায় ৩০০ একর জমির মালিকানা নিয়ে উচ্চ আদালতে মামলা চলছে। মামলায় সৈদরটুলা ছান্দের পক্ষে রায় হয়েছিল; সরকারপক্ষ সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছে। এখন আপিলের রায়ের অপেক্ষা করা হচ্ছে।’
‘জলাবনটিকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে প্রশাসনের উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে। এরই মধ্যে একটি প্রবেশদ্বারও নির্মাণ করা হয়েছে’— বললেন তিনি।



