সীমান্তে ইয়াবা লুটে কিশোর গ্যাংয়ের দাপট

ছবি: আগামীর সময়
সীমান্তপথে ইয়াবার চালান আসছে। আর সেই চালান ছিনিয়ে নিতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে কিশোর গ্যাং সদস্যরা। কক্সবাজারের রামু ও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি-আলীকদম সীমান্ত এলাকায় অন্তত শতাধিক কিশোর-তরুণ বিভিন্নভাবে সীমান্ত চোরাচালান, ইয়াবা পাচার ও ইয়াবা লুটের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাদের একটি অংশ আবার রাজনৈতিক দলের পরিচয় ব্যবহার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সরেজমিন অনুসন্ধান ও স্থানীয় একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
সূত্রগুলো বলছে, সীমান্তের দুর্গম ও জঙ্গলাকীর্ণ পথ ব্যবহার করে গত কয়েক বছরে মিয়ানমার থেকে ইয়াবার চালান আসার প্রবণতা বেড়েছে। এসব চালানের একটি অংশ স্থানীয়ভাবে লুটের শিকার হচ্ছে। আর সেই লুটের ঘটনায় জড়িয়ে পড়ছে অনেক তরুণ।
সীমান্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, নাইক্ষ্যংছড়ি ও আলীকদম সীমান্তের প্রায় ৪৫টি পয়েন্ট দিয়ে বিভিন্ন সময়ে মিয়ানমার থেকে ইয়াবার চালান বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এর মধ্যে সীমান্ত পিলার ৫৮, ৫৭, ৫৬, ৫৩, ৫২, ৫১, ৫০, ৪৯, ৪৮, ৪৭, ৪৬, ৪৪, ৪৩, ৪২, ৩৬, ৩৫, ৩৪, ৩৩ ও ৩১ নম্বর এলাকার দুর্গম পথগুলোকে চোরাচালানের রুট হিসেবে উল্লেখ করেছেন স্থানীয়রা।
সীমান্ত দিয়ে আসা এসব মাদকের চালান কক্সবাজারের বিভিন্ন উপজেলা হয়ে দেশের বড় শহরগুলোয় পৌঁছে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ঈদগাঁও, রামু, উখিয়া ও চকরিয়ার বিভিন্ন পথ ব্যবহার করা হচ্ছে বলে একাধিক সূত্রের দাবি।
স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, রামু ও উখিয়ার সীমান্তঘেঁষা আটটি ইউনিয়নসহ নাইক্ষ্যংছড়ি ও আলীকদমের বিভিন্ন এলাকায় বর্তমানে শতাধিক কিশোর-তরুণ ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে সক্রিয়। এসব দলের সদস্যসংখ্যা সাধারণত ৫ থেকে ১০ জন। বয়স ১২ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। তবে অনেক ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত যুবকরা এসব দলের নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
রামুর গর্জনিয়া, ঈদগড় এবং নাইক্ষ্যংছড়ির বাইশারী এলাকায় ছয়টির বেশি ডাকাত দল সক্রিয় রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি।
সীমান্তে ইয়াবা লুটের ঘটনা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। তাদের দাবি, গত এক মাসে বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৫০টির বেশি ইয়াবা লুটের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় কয়েক কোটি টাকার ইয়াবা লুট হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
ইদগড়, বাইশারী, মৌলভীকাটা, তিতারপাড়া, ফাক্রিকাটা, আদর্শগ্রাম, দৌছড়ি, তুলাতলী, কাউয়ারখোপ, তুলাতলী-২, বালুবাসা, হাজিরপাড়া ও ক্যায়জারবিলসহ আশপাশের বিভিন্ন গ্রামে এসব ঘটনা নিয়ে তোলপাড় চলছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
তবে এসব লুটের ঘটনায় কতটি মামলা হয়েছে, কত পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধার হয়েছে এবং অভিযোগের সত্যতা কতটুকু এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ইয়াবা লুট ও চোরাচালানের সঙ্গে জড়িতদের একটি অংশ নিজেদের রাজনৈতিক দলের কর্মী বা সমর্থক হিসেবে পরিচয় দেয়। এ কারণে অনেক সময় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনকে নানা চাপের মুখে পড়তে হয়।
পুলিশের কাছেও এ ধরনের অভিযোগ পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন নাইক্ষ্যংছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মোজাম্মেল হক। তার মতে, সীমান্ত এলাকায় কিশোর গ্যাং ও চোরাকারবারিদের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়।
ওসি মো. মোজাম্মেল হক বলেছেন, কিশোর গ্যাং নিয়ে পুলিশও বেকায়দায়। কারণ সীমান্ত এলাকা অনেক দূরে। পুলিশ লোকালয়ে কাজ করে, সীমান্তে নয়। তার পরেও কয়েক মাসে পুলিশ কয়েক কোটি টাকার ইয়াবা জব্দ করেছে লোকালয় থেকে। কিশোর গ্যাং বা চোরাকারবারীদের অপতৎপরতা রোধেও পুলিশ সচেষ্ট।
সম্প্রতি ইয়াবার চালান লুটপাটের খবরও পাচ্ছে পুলিশ। কোনো ঘটনা ঘটলে অনেকে রাজনৈতিক দলের পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করছে। এভাবে পক্ষ-বিপক্ষ তৈরি করে পুলিশকে ব্যবহার করার চেষ্টাও করা হয়। ফলে নানা কারণে পুলিশকে বেকায়দায় পড়তে হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সীমান্ত এলাকার দুর্গম ভূপ্রকৃতি, পাহাড়ি জঙ্গল ও অসংখ্য সরুপথ ব্যবহার করে চোরাকারবারিরা দ্রুত এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় চলে যায়। পরে ইয়াবার চালান লোকালয়ে ঢোকার পর বিভিন্ন গ্রুপ তা বহন ও সরবরাহের কাজে যুক্ত হয়। এই সুযোগেই কিশোর-তরুণদের একটি অংশ অপরাধচক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, সীমান্তে বিজিবির নজরদারি থাকলেও বিস্তৃত দুর্গম এলাকার প্রতিটি পথ সার্বক্ষণিক নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। ফলে সীমান্ত থেকে লোকালয়ে প্রবেশের পর মাদকবিরোধী অভিযানে পুলিশের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।



