খরায় পুড়ছে আমন, সেচের বাড়তি খরচে বিপাকে ঘোড়াঘাটের কৃষক

ঘোড়াঘাটের মাঠে মাঠে রোপা আমনের পরিচর্যায় ব্যস্ত কৃষকেরা। ছবি: আগামীর সময়
চলতি মৌসুমে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার মাঠে মাঠে রোপা আমনের পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকেরা। তবে দীর্ঘদিনের অনাবৃষ্টি ও তীব্র খরায় সেই ব্যস্ততায় এখন ভর করেছে হতাশা। বৃষ্টির অভাবে উঁচু জমির মাটি শুকিয়ে ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। বাধ্য হয়ে শ্যালো মেশিন ও গভীর নলকূপের সাহায্যে জমিতে সেচ দিতে হচ্ছে কৃষকদের। এতে বেড়ে যাচ্ছে উৎপাদন খরচ।
ঘোড়াঘাট উপজেলার বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, চারদিকে সবুজের সমারোহ। ধানের গাছ সবুজ হয়ে উঠেছে। বাম্পার ফলনের আশায় কৃষকেরা জমিতে ইউরিয়া সার প্রয়োগ করছেন। পাশাপাশি আগাছা পরিষ্কার ও পোকামাকড় দমনে কীটনাশক স্প্রে করছেন।
কৃষকেরা জানিয়েছেন, চলতি আমন মৌসুমের শুরুতে অনুকূল আবহাওয়া না থাকায় ধানের চারা রোপণে কিছুটা দেরি হয়েছে। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও অনেকে সেচ দিয়ে চারা রোপণ করেছেন। তবে গত প্রায় এক মাস ধরে পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় এখন উঁচু জমিতে সেচের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। ফলে এবার আমন চাষে খরচও বেড়েছে।
উপজেলা কৃষি দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর ঘোড়াঘাটের চারটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় মোট ১৭ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সম্ভাব্য উৎপাদন ধরা হয়েছে ৫৮ হাজার ১১ মেট্রিক টন।
স্থানীয় কৃষকেরা জানিয়েছেন, আমন মূলত বৃষ্টির পানিনির্ভর ফসল। কিন্তু দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হওয়ায় অনেক জমিতে সেচ দিতে হচ্ছে। স্বাভাবিক বৃষ্টির অভাবের পাশাপাশি ডিজেলের উচ্চমূল্যের কারণে সেচ খরচও বেড়েছে। অনেক ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক বাড়তি খরচ বহন করতে না পেরে বৃষ্টির অপেক্ষায় রয়েছেন।
মাঠের কোথাও কোথাও পানির অভাবে সদ্য রোপণ করা ধানের চারা হলদে হয়ে যাচ্ছে। আবার কোথাও চারা স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে পারছে না। এর মধ্যেই কৃষকেরা নিরানি দেওয়া, আগাছা পরিষ্কার, সার প্রয়োগ ও পোকামাকড় দমনের মতো প্রয়োজনীয় পরিচর্যা চালিয়ে যাচ্ছেন।
কৃষি দপ্তর জানিয়েছে, দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হওয়ায় উঁচু জমিগুলো শুকিয়ে গেছে। সামর্থ্যবান কৃষকেরা শ্যালো মেশিন ও গভীর নলকূপের সাহায্যে জমিতে সেচ দিচ্ছেন। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। অনাবৃষ্টির ধারা আরও দীর্ঘ হলে চলতি মৌসুমে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে ঘোড়াঘাটে সার বিক্রি নিয়েও ডিলার ও কৃষকদের মধ্যে কিছুটা জটিলতা তৈরি হয়েছে। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, জমির মাটির গুণাগুণ ও ফসলের ধরন বিবেচনা করে ‘খামারি অ্যাপ’ যে পরিমাণ সারের সুপারিশ করছে, ডিলাররা মূলত সেই পরিমাণ সারই বিক্রি করতে পারছেন। তবে কৃষকেরা তাঁদের দীর্ঘদিনের চাষাবাদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এর চেয়ে তিন থেকে চার গুণ বেশি সার, বিশেষ করে টিএসপি, দাবি করছেন।
ডিলারদের হিসাবে, বাজারে ডিএপি ও এমওপি সারের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও টিএসপি সারের চাহিদা বেশি। ঘোড়াঘাটের ১৯ জন নিবন্ধিত ডিলারের জন্য প্রতি মাসে টিএসপি সারের বরাদ্দ ১৩৫ মেট্রিক টন। কৃষকেরা প্রতি বিঘায় ১৫ থেকে ২০ কেজি টিএসপি দাবি করলেও খামারি অ্যাপ ও কৃষি বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী ৬ থেকে ৭ কেজি দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সারের কৃত্রিম সংকট ও অতিরিক্ত দামে বিক্রি ঠেকাতে উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ বাজারে নজরদারি ও যৌথ মনিটরিং করছে।
ঘোড়াঘাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোহাম্মদ রফিকুজ্জামান কৃষকদের অতিরিক্ত সার ব্যবহারে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, প্রয়োজনের অতিরিক্ত সার ব্যবহার করলেই ফলন বাড়বে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং এতে উৎপাদন খরচ বাড়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে মাটির গুণাগুণ নষ্ট হতে পারে।






