অবরোধে অচল সাজেক, পর্যটন বন্ধে বাড়ছে সংকট

পর্যটকশূন্য রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক। ছবি: আগামীর সময়
সড়ক অবরোধে পর্যটকশূন্য হয়ে পড়েছে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক। বন্ধ আছে পর্যটনকেন্দ্র, থমকে গেছে ব্যবসা-বাণিজ্য। পর্যটক না থাকায় আয় বন্ধ হয়ে পড়েছে রিসোর্ট, কটেজ, রেস্তোরাঁ ও পরিবহন খাতের।
অন্যদিকে সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ায় খাদ্যসামগ্রী, জ্বালানি ও ওষুধসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের সংকটে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এতে পর্যটনশিল্পে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি দুর্গম এই জনপদে বাড়ছে মানবিক উদ্বেগও।
সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের ডাকা অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ চলছে এখনো। গত ২২ অক্টোবর থেকে নতুন করে শুরু হওয়া এ কর্মসূচির কারণে সাজেকের সঙ্গে বাইরের সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে।
এর আগে শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত অবরোধ স্থগিত থাকায় পর্যটকদের জন্য সাজেক খুলে দেওয়া হয়েছিল। তবে নতুন করে অবরোধ শুরু এবং ২২ অক্টোবর উজোবাজার এলাকায় সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনার পর ২১ অক্টোবর সন্ধ্যা ৭টা থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাজেকে পর্যটকদের ভ্রমণ বন্ধ ঘোষণা করে জেলা প্রশাসন।
অবরোধ প্রত্যাহার ও সংকট নিরসনে প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাধিকবার আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হলেও চূড়ান্ত সমাধান আসেনি। গত ২৬ অক্টোবর বিকাল ৩টার দিকে সাজেক ইউনিয়নের উজোবাজারে অবরোধকারী সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল।
বৈঠকে নেতৃত্ব দেন খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ওয়াদুদ ভূঁইয়া। এতে রাঙামাটির সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ান, রাঙামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী, খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত, রাঙামাটির পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুর রকিব এবং খাগড়াছড়ির পুলিশ সুপার মো. মোরতোজা আলী খানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
অবরোধকারীদের পক্ষে বৈঠকে অংশ নেন সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক বাবুধন চাকমা, জিকু চাকমা, সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নতুন জয় চাকমা এবং ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদের প্রতিনিধি উষাতন চাকমা।
বৈঠকে পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরেন আন্দোলনকারীরা। বৈঠক শেষে সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূঁইয়া চারটি দাবির বিষয়ে অগ্রগতির কথা জানালেও একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবিতে সমঝোতা না হওয়ায় অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়ে ঐকমত্য হয়নি। ফলে সাজেকের পর্যটনকেন্দ্র কবে খুলবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি।
আন্দোলনকারীদের দাবির মধ্যে আছে সাজেক থেকে একটি আঞ্চলিক সংগঠনের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়া, স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আন্দোলনকারীদের ওপর হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তি, মামলা প্রত্যাহার এবং উজোবাজারে ভাঙচুর ও লুটপাটে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া। পাশাপাশি আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসাব্যয় বহন এবং স্থানীয়দের হয়রানি বন্ধের দাবিও রয়েছে। এসব বিষয়ে আলোচনা চললেও অবরোধ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত হয়নি।
অবরোধের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে সাজেকের পর্যটনশিল্পে। সাজেক রিসোর্ট-কটেজ মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, সেখানে প্রায় ২০০টি রিসোর্ট ও কটেজ রয়েছে। এ ছাড়া রেস্তোরাঁ, ভ্রাম্যমাণ দোকান, পর্যটকবাহী জিপ, পরিবহন এবং অন্যান্য সেবামূলক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বহু মানুষ।
পর্যটকদের আগমন বন্ধ থাকায় কার্যত থেমে গেছে এসব প্রতিষ্ঠানের আয়। অথচ কর্মচারীদের বেতন, প্রতিষ্ঠানের রক্ষণাবেক্ষণ, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বহন করতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের।
কটেজ অ্যান্ড রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব সাজেকের সাংগঠনিক সম্পাদক রাহুল চাকমা জানালেন, অবরোধের কারণে পর্যটকদের অগ্রিম বুকিং বাতিল হচ্ছে। দুর্গাপূজার ছুটি ও অক্টোবরের শেষ ভাগ পর্যন্ত অনেক রিসোর্ট-কটেজে বুকিং ছিল। কিন্তু সংঘাত ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে পর্যটকেরা ভ্রমণ বাতিল করায় বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা।
রাহুল চাকমা আরও জানালেন, সাজেকের ব্যবসার বড় অংশ নির্ভর করে ছুটির দিন, উৎসব ও শীতকালীন পর্যটন মৌসুমের ওপর। বছরের অন্যান্য সময়ে পর্যটক কম থাকায় এই মৌসুমের আয় দিয়ে অনেক ব্যবসায়ী আগের লোকসান পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ থাকায় তাদের সেই প্রত্যাশা ভেঙে পড়ছে। দীর্ঘদিন এ অবস্থা চললে রিসোর্ট-কটেজ মালিকদের পাশাপাশি কর্মচারী, জিপচালক, দোকানদার ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাও আর্থিক সংকটে পড়বেন।
তবে সংকট এখন আর শুধু ব্যবসায়িক ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ায় সাজেকের বিভিন্ন এলাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মজুত ফুরিয়ে আসছে।
স্থানীয় দোকানদারদের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক দিন ধরে নতুন পণ্যবাহী গাড়ি না পৌঁছানোয় কোনো কোনো দোকানে চাল ও চিনি শেষ হয়ে গেছে। ডাল, ভোজ্যতেল, জ্বালানি তেলসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর মজুতও কমছে। জ্বালানির অভাবে পানি পরিবহন ব্যাহত হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে।
স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, সর্বশেষ ২১ অক্টোবর পণ্যবাহী গাড়ি সাজেকে পৌঁছেছিল। এরপর নতুন করে পণ্য না আসায় দোকানগুলোতে সংকট বেড়েছে। স্থানীয় দোকানদার রবার্ট ত্রিপুরা জানিয়েছেন, পর্যটক না আসায় তাদের আয় বন্ধ হয়ে গেছে। একই সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মজুত কমে যাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটন খাতের কর্মীদের দৈনন্দিন জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে।
খাদ্যসংকটের পাশাপাশি চিকিৎসাসেবা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। সাজেকের দুর্গম এলাকায় কেউ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে বা দুর্ঘটনায় আহত হলে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া কঠিন হতে পারে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত সংবাদে জরুরি ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর ঘাটতির কথাও উঠে এসেছে। যোগাযোগব্যবস্থা স্বাভাবিক না হলে শিশু, প্রবীণ, অন্তঃসত্ত্বা নারী ও গুরুতর অসুস্থ ব্যক্তিদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা আরও কঠিন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে সাজেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তোফাজ্জল হোসেন জানিয়েছেন, এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। নতুন করে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক।





