কারাগার আছে, বন্দি নেই ৪২ বছর

বকশীগঞ্জে প্রায় আট বিঘা সরকারি জমির ওপর নির্মিত উপ-কারাগার
জামালপুরের বকশীগঞ্জে প্রায় আট বিঘা সরকারি জমির ওপর নির্মিত উপ-কারাগারটি চালু হয়নি ৪২ বছরেও। ১৯৮৪ সালে নির্মাণের পর একদিনের জন্যও বন্দি রাখা হয়নি সেখানে। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় ব্যারাক, প্রশাসনিক ভবন, আবাসিক কোয়ার্টার, মাঠ ও পুকুরসহ পুরো স্থাপনাটি এখন জরাজীর্ণ। কোটি টাকার সরকারি সম্পদ পরিণত হয়েছে প্রায় পরিত্যক্ত স্থাপনায়।
সরেজমিনে দেখা যায়, কারাগারের বিভিন্ন ভবনের দেয়ালে বড় বড় ফাটল ধরেছে। কোথাও ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ছে, কোথাও নষ্ট হয়ে গেছে দরজা-জানালা। চারপাশে গজিয়েছে ঝোপঝাড়। দীর্ঘদিনের অব্যবহারে পুরো চত্বরে তৈরি হয়েছে ভূতুড়ে পরিবেশ। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে স্থাপনাটি ধীরে ধীরে পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যেতে পারে বলে স্থানীয়দের আশঙ্কা।
সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯৮৪ সালে প্রায় ২ দশমিক ৭৩ একর বা আট বিঘা সরকারি জমির ওপর বকশীগঞ্জ উপ-কারাগার নির্মাণ করা হয়। এখানে বন্দিদের জন্য ব্যারাক, প্রশাসনিক ভবন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসিক কোয়ার্টার, খেলার মাঠ ও একটি বড় পুকুর নির্মাণ করা হয়েছিল। তবে নির্মাণে ব্যয় হওয়া অর্থের সঠিক তথ্য বর্তমানে পাওয়া যায়নি।
বকশীগঞ্জ ও দেওয়ানগঞ্জসহ সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে গ্রেপ্তার আসামিদের জামালপুর জেলা কারাগারে নিতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হতো। এতে সময় ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি বাড়ত। সেই ভোগান্তি কমানো এবং জেলা কারাগারের ওপর চাপ কমানোর উদ্দেশ্যেই উপ-কারাগারটি নির্মাণ করা হয়েছিল। তবে প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতায় এটি আর চালু হয়নি।
দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় স্থাপনাটির নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকায় কারাগারের কিছু অংশে অবৈধ দখল ও চাষাবাদের প্রবণতা দেখা দিয়েছে। সরকারি সম্পদ রক্ষায় দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে পুরো জায়গাটি বেদখলের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
বকশীগঞ্জ পৌর শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত এত বড় সরকারি জায়গাটি জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহারের দাবি দীর্ঘদিনের। স্থানীয়দের কেউ এখানে শিশু বিনোদন কেন্দ্র ও পার্ক, কেউ স্টেডিয়াম, কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, সরকারি কলেজ বা কোল্ড স্টোরেজ করার প্রস্তাব দিয়েছেন। তাদের মতে, এসব উদ্যোগ নেওয়া হলে শিক্ষা, ক্রীড়া, কৃষি ও স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক আফসার আলী জানিয়েছেন, ১৯৮৪ সালে তৎকালীন এরশাদ সরকারের আমলে কারাগারটি নির্মাণ করা হয়। চালু না হওয়ায় এটি এখন পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। মূল স্থাপনার কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখে এখানে শিশু বিনোদন কেন্দ্র করা যেতে পারে। পাশাপাশি কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণ করা হলে কৃষকরাও উপকৃত হবেন।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মোছা. কনিকা খাতুন জানিয়েছেন, ২০০৩ সালে স্থাপনাটি গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে হস্তান্তর করা হয়। এরপর উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের পক্ষ থেকে পরিত্যক্ত কারাগার, মাঠ ও পুকুর জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহারের চেষ্টা চলছে। মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা পাওয়া গেলে এটি জনগণের কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুরাদ হোসেন জানিয়েছেন, বকশীগঞ্জের পরিত্যক্ত উপ-কারাগারটি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে রয়েছে। এটিকে জনগণের সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।






