মীরবাগ ডিগ্রি কলেজ
মেয়াদ শেষেও অধ্যক্ষের চেয়ারে, কারাগারে থেকেও বেতন

সংগৃহীত ছবি
রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার মীরবাগ ডিগ্রি কলেজে প্রশাসনিক নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অধ্যক্ষের পদে বহাল থাকা, দীর্ঘদিন কলেজে অনুপস্থিত এক শিক্ষককে শিক্ষা ছুটির নামে বেতন দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই ছুটি কার্যকরের অভিযোগ রয়েছে প্রতিষ্ঠানটিতে। এর মধ্যে ওই শিক্ষক দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকলেও এমপিও সিটে তার নাম ছিল এবং বেতন-ভাতাও দেওয়া হয়েছে।
এসব অনিয়মের অভিযোগে সম্প্রতি কলেজটিতে তদন্ত করেছে রংপুর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। প্রাথমিক তদন্তে অধ্যক্ষ আবুল কালাম মো. জয়নুল আবেদীন এবং ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক মোহাম্মদ আলী বাবুর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাদের বিরুদ্ধে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে বলেও জানিয়েছেন তারা।
মেয়াদ শেষ, তবু অধ্যক্ষের পদে
কলেজসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত বছরের ৩০ নভেম্বর অধ্যক্ষ আবুল কালাম মো. জয়নুল আবেদীনের চাকরির মেয়াদ শেষ হয়। এরপরও তিনি অধ্যক্ষের দায়িত্বে থেকে যান। চাকরির মেয়াদ বাড়ানোর জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করলেও তা যথাসময়ে না করায় আবেদনটি নাকচ হয়।
এরপর চলতি বছরের ৫ এপ্রিল রংপুর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর কলেজের একজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেওয়ার জন্য কলেজ কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয়।
তবে এর পরদিন, ৬ এপ্রিল, অধ্যক্ষ জয়নুল আবেদীন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি চিঠি দেখিয়ে তার মেয়াদ এক বছর বাড়ানো হয়েছে বলে দাবি করেন এবং অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখেন। যদিও তত দিনে তার মূল চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় ছয় মাস পেরিয়ে গেছে।
কলেজের দুজন শিক্ষক বললেন, অধ্যক্ষের বিভিন্ন অনিয়মের কারণে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা নিয়ে একাধিকবার জটিলতা তৈরি হয়েছে। এতে কলেজের স্বাভাবিক পরিবেশও ব্যাহত হচ্ছে। তারা বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্ত করে দ্রুত সমাধানের দাবি জানান।
কারাগারে থেকেও বেতন
কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক মোহাম্মদ আলী বাবুকে ঘিরেও রয়েছে নানা অভিযোগ। হজে পাঠানো এবং চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে।
২০২৪ সালে হজে পাঠানোর কথা বলে ৭৫ জন হজযাত্রীর সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। ওই ঘটনায় ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগে চিঠি দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করে। এর আগে হজযাত্রীদের সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগে দিয়া ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি হজ এজেন্সির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী বাবুসহ তিনজনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্যও চিঠি দিয়েছিল ধর্ম মন্ত্রণালয়।
২০২৪ সালের শেষ দিকে নীলফামারী থেকে বাবুকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে জামিনে মুক্তি পেলেও আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানার ভিত্তিতে গত ১৫ মে রংপুর মহানগর এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে তাকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর প্রায় দুই মাস কারাগারে ছিলেন তিনি।
পুলিশের তথ্যমতে, মোহাম্মদ আলী বাবুর বিরুদ্ধে নীলফামারী থানায় দুটি এবং রংপুর আদালতে তিনটি মামলা রয়েছে।
কলেজে অনুপস্থিত, তবু বেতন
অভিযোগ রয়েছে, মোহাম্মদ আলী বাবু দীর্ঘদিন ধরে কলেজে আসেন না। এমনকি কারাগারে থাকার সময়ও তার নাম কলেজের এমপিও সিটে ছিল এবং গত জুলাই মাস পর্যন্ত তিনি নিয়মিত বেতন-ভাতা পেয়েছেন।
কলেজের উপস্থিতি রেজিস্টারে অবশ্য গত ১০ মে থেকে তার নামের পাশে ‘শিক্ষা ছুটি’ উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু ওই ছুটির অনুমোদন যথাযথ প্রক্রিয়ায় হয়েছিল কি না, তা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠেছে।
কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, তারা দীর্ঘদিন ধরে ‘বাবু স্যারকে’ কলেজে দেখেননি। অনেক শিক্ষার্থী তার নামও জানেন না।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে মোহাম্মদ আলী বাবু বলেন, কলেজের ম্যানেজিং কমিটির সভায় তার শিক্ষা ছুটির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতিপত্রের বিষয়ে তিনি বললেন, এ বিষয়ে অধ্যক্ষ ভালো বলতে পারবেন। কোন বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের জন্য তিনি শিক্ষা ছুটিতে আছেন—জানতে চাইলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়ের নাম বলতে পারেননি।
‘শিক্ষা ছুটির অনুমোদন যথাযথ হয়নি’
মোহাম্মদ আলী বাবু দীর্ঘদিন, প্রায় দুই বছর, কলেজে অনুপস্থিত ছিলেন বলে স্বীকার করেছেন অধ্যক্ষ আবুল কালাম মো. জয়নুল আবেদীন। তিনি বলেন, ‘তার শিক্ষা ছুটির অনুমোদন যথাযথ প্রক্রিয়ায় হয়নি। এটা আমার ভুল হয়েছে।’
কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি সেকেন্দার আলী বললেন, শিক্ষা ছুটির বিষয়ে কমিটির সভায় প্রাথমিকভাবে আলোচনা হয়েছিল। পরবর্তী সভায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতিপত্রসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখানোর কথা ছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত মোহাম্মদ আলী বাবু এসব কাগজপত্র দেখাতে পারেননি।
তদন্তে অনিয়মের সত্যতা
অভিযোগগুলোর তদন্তে সম্প্রতি মীরবাগ ডিগ্রি কলেজে যান রংপুর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।
মাউশির উপপরিচালক (কলেজ) কামরুজ্জামান পাইকাড় বলেন, শিক্ষক মোহাম্মদ আলী বাবু দীর্ঘদিন কলেজে অনুপস্থিত ছিলেন। উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের জন্য তার শিক্ষা ছুটির আবেদন ও অনুমোদনও যথাযথ প্রক্রিয়ায় হয়নি। এরপরও তাকে শিক্ষা ছুটির নামে বেতন দেওয়া হয়েছে।
অধ্যক্ষের বিষয়ে তিনি বললেন, আবুল কালাম মো. জয়নুল আবেদীনের চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আরও ছয় মাস তিনি কীভাবে অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেছেন, তা স্পষ্ট নয়। এ বিষয়ে তার কাছে লিখিত ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
কামরুজ্জামান পাইকাড় স্পষ্ট করেন, ‘তাদের দুজনের অনিয়মের সত্যতা পাওয়া গেছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।’
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর, রংপুর অঞ্চলের পরিচালক অধ্যাপক গোলাম মাজেদ বললেন, ‘যেকোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে আমরা বদ্ধপরিকর। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’






