‘চলে যাচ্ছি মা, আর কথা হবে না’

সৌদি আরবে আগুনে পুড়ে নিহত একজনের মা-বাবার আহাজারি। ছবি: আগামীর সময়
কারখানায় আগুন লাগার পর মোবাইল ফোনে একটি ভয়েস ম্যাসেজ পান ময়না খাতুন। পাঠিয়েছেন তার ছেলে মোহন প্রামাণিক। অডিও বার্তায় তিনি বলেছিলেন, ‘চলে যাচ্ছি মা, আর কথা হবে না।’ এরপর খবর এলো, আগুনে পুড়ে মৃত্যু হয়েছে মোহন ও তার ভাই সুমনের। ছেলের সেই শেষ অডিও বার্তা বারবার কানে বাজে ময়না খাতুনের।
গত রবিবার সৌদি আরবের রিয়াদের শিফা এলাকার সোফা তৈরির কারখানায় লাগা আগুনে সহকর্মীদের সঙ্গে মারা গেছেন মোহন ও তার ছোট ভাই সুমন প্রামাণিক। তাদের বাড়ি নওগাঁর আত্রাই উপজেলার গণ্ডগোহালী গ্রামে। ১৬ জন বাংলাদেশি সেখানে মারা গেছেন। এর মধ্যে ১৩ জনের বাড়ি আত্রাইয়ে।
দুই ছেলেকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ বাবা গাফফার প্রামাণিক। বাড়ির চারপাশে পড়ে আছে নির্মাণ সামগ্রী। স্বজনরা জানালেন, বাড়ির নির্মাণকাজ শেষের পর দেশে ফিরে মোহনের বিয়ে করার কথা ছিল। সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। নির্মাণসামগ্রীগুলো এখন সেই স্বপ্নেরই সাক্ষী হয়ে আছে।
মোহন ও সুমনের মা জানালেন, ছেলের সঙ্গে শেষ কথোপকথনের কথা মনে পড়লেই তার বুক ফেটে যায়। এখন তার একটাই ইচ্ছা। ছেলের মরদেহ দেশে এনে একবার নিজের চোখে দেখা এবং পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা।
দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে কাজ করছিলেন আত্রাইয়ের ওই ১৩ জন। পরিবারের আর্থিক সংকট দূর করা, সংসারের দেনা শোধ করা এবং একসময় দেশে ফিরে স্বজনদের নিয়ে স্বচ্ছন্দে জীবন কাটানোর স্বপ্ন ছিল তাদের। অনেকে স্বপ্ন পূরণের কাছাকাছিও পৌঁছেছিলেন। কিন্তু আগুনে থেমে গেল তাদের জীবন। স্বপ্নগুলোও রয়ে গেল অধরা।
নিহতদের মধ্যে আছেন এ গ্রামের কলিমউদ্দিন প্রামাণিক। প্রায় আট বছর আগে সৌদি আরবে পাড়ি জমান তিনি। ছেলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন তার মা কারিমা বেগম।
আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে অঙ্গার হয়েছেন গণ্ডগোহালী গ্রামের মো. রুবেল। তিনি ১০ বছর ধরে ওই কারখানায় কাজ করতেন। বছরখানেক আগে ছুটিতে বাড়ি এসে বিয়ে করেন। স্ত্রীকে বাবা-মায়ের সঙ্গে রেখে চলে যান রিয়াদে। মাত্র ১৫ দিন আগে মেয়ের বাবা হয়েছেন। তাকে ছুঁয়েও দেখতে পারলেন না রুবেল। তিনি নিজেও বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। ছেলেকে হারিয়ে দিশাহারা বাবা সাইদুর রহমান।
এক সঙ্গে এত মৃত্যুতে আত্রাইয়ের বিভিন্ন গ্রামে নেমেছে শোকের ছায়া। চারপাশে শুধু স্বজনদের কান্না। মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
আগুনে নিহত আত্রাইয়ের যুবকরা হলেন— বিশা ইউনিয়নের ডুবাই গ্রামের মৃত বাদলের ছেলে মো. সুমন (৩৫) ও মো. চঞ্চলের ছেলে হাসিবুল হাসান শুভ (২৭), কালিকাপুর ইউনিয়নের গণ্ডগোহালী গ্রামের গাফফার প্রামাণিকের ছেলে মোহন প্রামাণিক ও সুমন প্রামাণিক, মো. জান্নারের ছেলে রুবেল হোসেন (৩০) এবং বজলুর প্রামাণিকের ছেলে কলিমউদ্দিন প্রামাণিক (৩৫), পারকাসুন্দা গ্রামের মৃত তমেজ উদ্দিনের ছেলে আব্দুল জলিল (৩৮), বিশা গ্রামের আজহারের ছেলে মো. সাগর (৩১) ও মজনুর ছেলে মো. মজিদুল (৩৪), উদনপৈ গ্রামের ময়েন শেখের ছেলে ফরিদ শেখ (৩২), আত্রাই উপজেলার মো. মিনহাজ, বোয়ালা গ্রামের মো. হৃদয় এবং নওগাঁ গ্রামের মো. শাহিন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মনিরুজ্জামান বলেছেন, ‘মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
নিহতদের পরিবারের সঙ্গে প্রশাসনের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম।







