বৃষ্টিতে হাবুডুবু সিলেট চট্টগ্রাম
- পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর ১০ পদক্ষেপ
- আরও ৬ মৃত্যু, বন্যা-ভূমিধসে প্রাণহানি বেড়ে ৩৬

হবিগঞ্জে খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে ঢলের পানি লোকালয়ে - আগামীর সময়
সপ্তাহখানেক ধরে চলছে প্রবল বর্ষণ। বিপদ বাড়াচ্ছে ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে এরই মধ্যে দেখা দিয়েছে দুর্যোগের ঘনঘটা। তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ এলাকা। আশ্রয়কেন্দ্রে গেছেন লাখো মানুষ। পরিস্থিতি আরও নাজুক করেছে পাহাড়-ভূমিধস। তাই থামেনি মৃত্যুর মিছিল। গতকাল শুক্রবার নতুন করে পাওয়া গেছে আরও ছয়জনের মারা যাওয়ার খবর।
এর মধ্যে কক্সবাজারে ২, চট্টগ্রামে ৩ ও মৌলভীবাজারের একজন। মোট প্রাণহানি দাঁড়াল ৩৬ জনে। এ ছাড়া স্থগিত করা হয়েছে চট্টগ্রাম বোর্ডের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। দেশের বিভিন্ন জেলার যখন এই চিত্র, তখন রাজধানীতেও ডুবে আছে বিভিন্ন সড়ক। দুদিনের টানা বৃষ্টিতে অনেক নিচু এলাকায় এখনো হাঁটু ও কোমরসমান পানি। চট্টগ্রামে আরও অবনতি হয়েছে বন্যা পরিস্থিতির। সঙ্গে বাড়ছে প্রাণহানি। গতকাল পানিতে ভেসে েগছে আরও তিন শিশু। পরে তাদের লাশ উদ্ধার করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও উদ্ধারকারীরা। দক্ষিণ চট্টগ্রামের বন্যাদুর্গত বাঁশখালীতে পাহাড়ি ঢল ও বানের পানির স্রোতে ঘটেছে এসব প্রাণহানি। এ ছাড়া চট্টগ্রাম নগরীর অধিকাংশ এলাকা এখনো পানির নিচে। আবার ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকায় ডুবছে নতুন নতুন এলাকা। সঙ্গে ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বিপর্যস্ত পার্বত্য এলাকার মানুষ। দুর্যোগ পরিস্থিতির কারণে স্থগিতই রাখা হয়েছে চট্টগ্রাম বোর্ডের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা।
এখন সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাঁশখালী। উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নের ২১২টি গ্রামের অধিকাংশই পানির নিচে। বাহারছড়া ইউনিয়নসহ বিভিন্ন এলাকায় কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমর, আবার কোথাও গলাসমান পানি জমেছিল। এর মধ্যেই বঙ্গোপসাগরের বেড়িবাঁধ ভেঙে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে উপকূলীয় এলাকায়।
সিলেট বিভাগের অবস্থাও খারাপ: মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জসহ সিলেট বিভাগের বন্যা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি হয়েছে। এরই মধ্যে মৌলভীবাজারের রাজনগরে বন্যার পানিতে আটকা পড়ে মৃত্যু হয়েছে এক বৃদ্ধের। নদীভাঙনের আতঙ্কে পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেলেও ঘরেই থেকে গিয়েছিলেন তিনি। গতকাল সকালে বসতঘর থেকে উদ্ধার হয়েছে তার মরদেহ।
হবিগঞ্জে ভিটামাটি ছেড়ে আশ্রয়ের খোঁজে হাজারো পরিবার। বানের জলে তলিয়ে যাওয়া ভিটামাটি ছেড়ে কেউ ছুটছেন আত্মীয়ের বাড়িতে, কেউ আশ্রয় নিচ্ছেন বিদ্যালয় কিংবা ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে। হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের বন্যার চিত্র এটি।
কক্সবাজার আরও বিপর্যস্ত, প্রাণহানি বেড়ে ২৬: টানা সাত দিনের ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢলে নদনদী উপচে জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছে কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকার বসতি। বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে জেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় দেখা দিয়েছে ভয়াবহ বন্যা। বিপৎসীমার ওপর দিয়ে বইছে মাতামুহুরী ও বাঁকখালী নদীর পানি। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে আজ শনিবার পর্যন্ত। এতে চকরিয়া, পেকুয়া, মাতামুহুরী, রামু, কক্সবাজার সদর, মহেশখালী, উখিয়াসহ বিভিন্ন উপজেলার লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। পাহাড়ধস, নৌকাডুবি, পানিতে ডুবে ও অন্যান্য দুর্ঘটনায় প্রাণহানি বেড়ে অন্তত ২৬ জনে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে গতকাল মিলেছে দুজনের মৃত্যুর খবর। নিহতদের মধ্যে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পেরই ১৫ জন।
বানের পাশাপাশি জনজীবন বিপর্যস্ত করে তুলেছে পাহাড়ধস। বৃহস্পতিবার রাতে চকরিয়ার বরইতলী ইউনিয়নের মোহছেনিয়াকাটা এলাকায় পাহাড়ধসে নিহত হয়েছে আরও দুজন। তারা হলো রুমি আক্তার (১৫) ও মোহাম্মদ তৌসিফ (১০)। তারা সম্পর্কে চাচাতো-জ্যাঠাতো ভাইবোন।
এরই মধ্যে উত্তাল সাগর। এ কারণে টানা সাত দিন ধরে বন্ধ আছে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন, কক্সবাজার-মহেশখালী এবং পেকুয়া-কুতুবদিয়া নৌপথে নৌযান চলাচল। আটকা পড়েছেন হাজারো যাত্রী। তবে দ্বীপাঞ্চলে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ ও জরুরি যাতায়াত সীমিতভাবে চালু রয়েছে।
টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল, পাহাড়ধস ও আকস্মিক বন্যায় বিপর্যস্ত কক্সবাজারে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য জোরদার করা হয়েছে সরকারি ত্রাণ সহায়তা। দুর্যোগ মোকাবিলায় দুই দফায় জেলার জন্য ৩০ লাখ টাকা এবং ৪৫০ টন চাল বরাদ্দ দিয়েছে সরকার।
এ তথ্য নিশ্চিত করে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আজাদের রহমান জানালেন, এরই মধ্যে কক্সবাজার সদর ও রামু উপজেলায় বিতরণ শেষ হয়েছে ত্রাণ। অন্য উপজেলায়ও বিতরণ করা হচ্ছে পর্যায়ক্রমে।
ঢাকায়ও হাঁটুপানি: সপ্তাহখানেক ধরেই কমবেশি সারা দেশে পড়ছে বৃষ্টি। তবে দুদিন ধরে বিরামহীন বর্ষণে থমকে গেছে রাজধানীর অনেক নিচু এলাকার মানুষের জীবন। রাজধানীর নিউ মার্কেট, তেজগাঁও, শান্তিনগরসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রায় সারা দিনই থাকছে হাঁটু ও কোমরসমান পানি। নিউ মার্কেটসহ কয়েকটি এলাকায় পানি ঢুকে নষ্ট হয়ে গেছে দোকানের জিনিসপত্র।
প্রধানমন্ত্রীর ১০ পদক্ষেপ: দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশিত ১০টি পদক্ষেপের কথা জানিয়েছেন তার উপদেষ্টা ও কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। সেগুলো হলো— সার্বক্ষণিক দুর্যোগকবলিত এলাকার খোঁজখবর নেওয়ার পাশাপাশি মনিটরিং করছেন প্রধানমন্ত্রী ও তার কার্যালয়, নিয়মিতভাবে ডিসি, ইউএনও এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দেওয়া হচ্ছে দিকনির্দেশনা; চট্টগ্রামে ১ হাজার ৫৭টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হয়েছে, যেখানে আশ্রয় নিয়েছে ১২ সহস্রাধিক মানুষ; ক্ষতিগ্রস্ত চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের দুর্গতদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ
টাকার অনুদান, ৩ হাজার ৪৫০ টন চাল এবং নিশ্চিত করা হচ্ছে নিরাপদ খাবার পানি, স্যানিটেশন ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা, শিশুখাদ্য, তিন বেলার খাবার।
পদক্ষেপের মধ্যে আরও আছে— জরুরি পরিস্থিতি বিবেচনায় পাহাড়ি এলাকায় উদ্ধার কার্যক্রমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সেনাবাহিনীও মোতায়েন করা হচ্ছে; দুর্গতদের কাছে প্রধানমন্ত্রীর সহায়তার বার্তা পৌঁছে দিচ্ছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জনপ্রতিনিধিরা, পাশেও দাঁড়াচ্ছেন; মাঠে নামানো হয়েছে বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মী এবং সরকারের প্রশাসন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সেনাবাহিনী ও কোস্ট গার্ড সদস্যদের; দুর্গত এলাকায় স্থগিত করা হয়েছে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা; দুর্যোগে হতাহতদের পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানাতে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা নেতাকর্মীদের নিয়ে পরিদর্শন করছেন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের বাড়ি; তলিয়ে যাওয়া চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেলপথের জলাবদ্ধতার ঝুঁকি কমাতে সেটি পাঁচ ফুট উঁচু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে; ৪৭ কিলোমিটার রেলপথের উচ্চতা বাড়ানোর কাজের দরপত্রের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে এবং পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকা বাসিন্দাদের জন্য নিরাপদ স্থানে স্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করবে সরকার।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য: গতকাল প্রকাশিত বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের (এফএফডব্লিউসি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী দ্রুত অবনতি হচ্ছে দেশের পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির। বর্তমানে দেশের নদী পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রগুলোর মধ্যে ১০টি স্টেশন বন্যা পর্যায়ে এবং ৯টি স্টেশন সতর্কতা পর্যায়ে। বিশেষ করে ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
‘বান্দরবানের মাতামুহুরী ও সাঙ্গু নদী, নোয়াখালীর ডাকাতিয়া নদী, হবিগঞ্জের খোয়াই নদী, মৌলভীবাজারের মনু নদ এবং সিলেট ও সুনামগঞ্জ অঞ্চলের কুশিয়ারা, সুরমা ও মেঘনা নদীর বিভিন্ন স্থানে পানি অতিক্রম করেছে বিপৎসীমা। একই সঙ্গে নেত্রকোনার সোমেশ্বরী নদী এবং তিস্তা নদীর নীলফামারী, রংপুর ও গাইবান্ধার বিভিন্ন পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে’— দেখা গেছে সর্বশেষ পর্যবেক্ষণে।
আরও অতিভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা: বৈশ্বিক আবহাওয়া পূর্বাভাস মডেলগুলোর সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে চলমান ভারী বৃষ্টিপাত ১৪ জুলাই পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগরে নতুন একটি মৌসুমি লঘুচাপ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। এর ফলে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে আরও বেশি জলীয় বাষ্প প্রবেশ করতে পারে এবং ১০ থেকে ১৩ জুলাই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে চট্টগ্রাম বিভাগ, সিলেট বিভাগ, পার্বত্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং ভারতের ত্রিপুরা অঞ্চলে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা।
সাত উপজেলায় সেনা মোতায়েন: ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতে সৃষ্ট বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় চট্টগ্রামের সাত উপজেলায় সেনা মোতায়েন করেছে সরকার। গতকাল আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) থেকে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে এ তথ্য।
আইএসপিআর জানায়, চট্টগ্রাম জেলায় ভারী বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলের কারণে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার জন্য ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের জরুরি অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে বন্যাদুর্গত বিভিন্ন উপজেলায় অনুসন্ধান, উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশন ও ২৪ পদাতিক ডিভিশন।




