রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
প্রক্টরের স্বীকারোক্তি ‘আমরা ব্যর্থ’, পুলিশও ভয়ে আসেনি

ছবি: আগামীর সময়
রবিবার রাত সাড়ে ৮টা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে তখন উত্তেজনা। ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা অবস্থান করছেন সেখানে। কয়েকজনের হাতে দেখা যায় দেশীয় অস্ত্র। রামদা, চাপাতি, হকিস্টিক, পাইপ ও বেসবল ব্যাট। সেই দৃশ্য ক্যামেরায় ধারণ করতে এগিয়ে যান সাংবাদিকেরা। এরপরই বদলে যায় পরিস্থিতি।
সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হওয়ার অভিযোগ ওঠে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। আগামীর সময়ের রাবি প্রতিনিধি জাহিদুল ইসলামসহ একে একে চার সাংবাদিক আক্রান্ত হন। কারও মুঠোফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কাউকে লাঠি দিয়ে মারধর করা হয়।
একপর্যায়ে মাথায় আঘাত পান দৈনিক আগামীর সময়ের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি জাহিদুল ইসলাম। রক্তাক্ত-জখম হন তিনি। আহত হন আরও কয়েকজন সাংবাদিক ও শিক্ষার্থী।
ঘটনার পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মাহবুবুর রহমানের একটি বক্তব্য যেন পুরো পরিস্থিতিরই প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।
তিনি বলেছেন, ‘আমরা ব্যর্থ। আমাদের দ্বারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। আমরা পুলিশকে ফোন দিয়েছি। কিন্তু পুলিশও ভয়ে পালিয়ে গেছে।’
রবিবার (৪ অক্টোবর) রাত সাড়ে ৮টার দিকে শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে এ ঘটনা ঘটে।
রাবিতে সাংবাদিকদের ওপর ছাত্রদলের হামলা, তদন্ত ও জবাবদিহি চায় ফ্রান্সের এফবিজেএ
০৫ অক্টোবর ২০২৬
প্রত্যক্ষদর্শী ও ঘটনাস্থলে থাকা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাত ৮টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন মার্কেট থেকে মিছিল নিয়ে শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে যান ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।
অভিযোগ, হল সংসদের জিএস আরিফুল ইসলামকে মারধর করতেই তারা সেখানে যান। মিছিল থেকে আসা কয়েকজনের হাতে ছিল দেশীয় অস্ত্র। তাদের হাতে রামদা, চাপাতি, হকিস্টিক, পাইপ ও বেসবল ব্যাট দেখা যায় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান প্রক্টর মাহবুবুর রহমান।
প্রক্টর সেখানে পৌঁছানোর পর ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা অস্ত্রগুলো আড়াল করেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য। কিছুক্ষণ পর আবার কয়েকজনের হাতে অস্ত্র দেখতে পান সাংবাদিকেরা।
তখন বিষয়টি ভিডিও ধারণ করতে এগিয়ে যান দৈনিক সমকাল ও আজকের পত্রিকার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধিরা।
অভিযোগ, এ সময় সমকালের প্রতিনিধিকে লাঠি দিয়ে মারধর করা হয়। আজকের পত্রিকার প্রতিনিধির মুঠোফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
একপর্যায়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিনিধিকেও মারধর করা হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে সাংবাদিকদের হলের ভেতরে নিয়ে যান প্রক্টর। দরজা বন্ধ করে দেন। কিন্তু বাইরে তখনও উত্তেজনা।
সাংবাদিকদের ওপর হামলার খবর পেয়ে আরও কয়েকজন সাংবাদিক ঘটনাস্থলে যান।
তাদেরও আক্রমণের শিকার হতে হয় বলে অভিযোগ। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিনিধি নূর আহসান মৃদুল ও আগামীর সময়ের প্রতিনিধি জাহিদুল ইসলামকে মারধর করা হয়। আঘাতে জাহিদুলের মাথা ফেটে যায়। রক্তে ভিজে যায় তার পোশাক।
সহকর্মীকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসেন অন্য সাংবাদিকেরা। অভিযোগ, তখন তাদেরও হুমকি দেওয়া হয়। এমনকি ‘পুতে ফেলার’ হুমকিও দেওয়া হয়।
একটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার ঘটনায় তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। ঘটনার পর অবশ্য হামলার অভিযোগ অস্বীকার করে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী।
তিনি হামলার জন্য ছাত্রশিবিরকে দায়ী করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘সাংবাদিক ও ছাত্রদলের মধ্যে দূরত্ব তৈরিতে ছাত্রশিবির চক্রান্ত করছে।’
রাহী আরও লিখেছেন, ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকরা আমাদের ভাই, আমাদের বন্ধু এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমরা বিশ্বাস করি, সাংবাদিকরা জাতির বিবেক ও সত্য প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম।’
তবে হামলার সময় ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের হাতে দেশীয় অস্ত্র এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলার ছবি ও ভিডিও প্রকাশ্যে এলেও এ বিষয়ে সরাসরি কোনো ব্যাখ্যা দেননি তিনি। বরং তিনি দাবি করেছেন, কোনো সাংবাদিককে ইচ্ছাকৃতভাবে আঘাত করা হয়নি।
তার ভাষ্য, ‘রাবি ছাত্রদলের কোনো নেতাকর্মী ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো সাংবাদিক ভাইয়ের গায়ে হাত তুলবে না। রাবি ছাত্রদল ও সাংবাদিকদের মধ্যে দূরত্ব ও ভুল বোঝাবুঝি তৈরি করতে শিবিরের অপচেষ্টার আমরা নিন্দা জানাই।’
ঘটনাটিকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল বোঝাবুঝি’ আখ্যা দিয়ে তদন্তের আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি। রাহী লিখেছেন, ‘আজকের ঘটনায় কোনো সাংবাদিক ভাই অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ভুল বোঝাবুঝির শিকার হয়ে থাকলে, বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবো।’
তবে সাংবাদিকদের ওপর হামলাকারী ছাত্রদলের আরেক নেতার বক্তব্যে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র।
হামলার সময়ের একটি ভিডিওতে দেখা যাওয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সহসভাপতি আহসান হাবিব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাংবাদিকদেরই ‘গুপ্ত শিবির’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তিনি লিখেছেন, ‘কোনও নিরপেক্ষ সাংবাদিকের ওপর হামলা করা হয়নি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কটূক্তিকারী সাবেক ছাত্রলীগ নেতা, জিয়া হলের জিএস আরিফুলকে ধরতে জিয়া হলে গেলে সংক্ষুব্ধ ছাত্রদল নেতাকর্মীদের ওপর যেসব সাংবাদিক নামধারী গুপ্ত শিবির ছানা হামলা করতে এসেছে তাদের প্রতিহত করা হয়েছে মাত্র।’
একই ঘটনার পর ছাত্রদলের দুই নেতার বক্তব্যেও দেখা যাচ্ছে ভিন্ন সুর। একজন বলছেন ‘ভুল বোঝাবুঝি’। অন্যজন সাংবাদিকদের ‘গুপ্ত শিবির’ আখ্যা দিয়ে হামলাকে ‘প্রতিহত’ করার দাবি করছেন।
এর মধ্যে রক্তাক্ত হয়েছেন সাংবাদিকেরা। মাথায় আঘাত নিয়ে হাসপাতালে যেতে হয়েছে জাহিদুলকে। আহত হয়েছেন আরও কয়েকজন। আর পুরো ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি তুলেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর নিজেই। ‘আমরা ব্যর্থ।’
এই দুটি শব্দই যেন রাতের ঘটনার সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হয়ে সামনে এসেছে। যে ক্যাম্পাসে সাংবাদিকেরা তথ্য সংগ্রহ করবেন, শিক্ষার্থীরা নিরাপদে চলাচল করবেন, সেখানে অস্ত্রের উপস্থিতি এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগ নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নিয়ে।





