চারজনের স্বপ্নযাত্রা, ফিরছেন তিনজন
- সন্তানকে হারিয়ে দেশে ফিরছেন নিউজিল্যান্ডের পরিবারটি
- কোটি টাকার ‘আইল্যান্ড গার্ল’ পড়ে আছে বাঁকখালীতে
- কক্সবাজারেই দাহ ১৬ বছরের আলবার্টের
- বিকল্প ব্যবস্থায় দেশে ফিরছেন পরিবারের সদস্যরা

ছবি: আগামীর সময়
একসঙ্গে দেশে ফেরার স্বপ্ন ছিল চারজনের। সমুদ্রপথে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত ঘুরে নিজেদের তৈরি নৌযান ‘আইল্যান্ড গার্ল’ নিয়ে নিউজিল্যান্ডে ফেরার পরিকল্পনা ছিল জন এডওয়ার্ড পুডনি, তার স্ত্রী বেলা এবং দুই ছেলে আলবার্ট ও রালফের। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন শুধুই স্মৃতি। আগামী ৯ অক্টোবর তিনজন ফিরবেন দেশে। কিন্তু সঙ্গে থাকবে না ১৬ বছরের আলবার্ট। সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার স্বপ্ন শেষ করে সন্তানকে কক্সবাজারের মাটিতে দাহ করে এখন শূন্য হাতে দেশে ফিরতে হচ্ছে তাদের।
গত ২৫ আগস্ট মহেশখালী চ্যানেলের মোহনায় বড় ঢেউ ও তীব্র স্রোতের মুখে পড়ে ডুবে যায় পরিবারের স্বপ্নের নৌযান ‘আইল্যান্ড গার্ল’। সাগর থেকে জন এডওয়ার্ড, তার স্ত্রী বেলা ও ১৩ বছরের রালফকে জীবিত উদ্ধার করেন স্থানীয় জেলেরা। কিন্তু নিখোঁজ হয়ে যান আলবার্ট। প্রায় ৩২ ঘণ্টা পর তাঁর মরদেহ ভেসে ওঠে সমিতিপাড়া উপকূলে।
আইনগত প্রক্রিয়া ও ময়নাতদন্ত শেষে নিউজিল্যান্ডের দূতাবাস এবং পরিবারের অনুমতি নিয়ে গত ১৫ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারেই আলবার্টের দাহকর্ম সম্পন্ন করা হয়। এখন সেই শহর ছেড়ে দেশে ফিরছেন তার বাবা, মা ও ছোট ভাই। সঙ্গে থাকবে না পরিবারের সেই সন্তান, যার জন্য দীর্ঘদিনের সমুদ্রযাত্রার স্বপ্নটি আর পূর্ণ হলো না।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, পরিবারের তিন সদস্যের দেশে ফেরার প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। নৌকাডুবির পর থেকে প্রায় দেড় মাস তারা জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে পর্যটন করপোরেশনের মোটেল শৈবালে অবস্থান করছেন। নিরাপত্তার জন্য সেখানে পুলিশও মোতায়েন রয়েছে।
জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদুর রহমান এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তার ভাষ্য, ৯ অক্টোবর পরিবারের তিন সদস্যের দেশে ফেরার সব ব্যবস্থা সম্পন্ন হয়েছে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান জানালেন, নৌকাডুবির পর স্থানীয় জেলেরা জন এডওয়ার্ড, বেলা ও রালফকে উদ্ধার করে তীরে নিয়ে আসেন। পরে তাদের কোস্টগার্ডের কক্সবাজার স্টেশনে নেওয়া হয়। সেখান থেকে জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে তাদের মোটেল শৈবালে রাখা হয়। ক্ষতিগ্রস্ত নৌযানটি এখন কোস্টগার্ডের হেফাজতে রয়েছে। উদ্ধার করা কিছু জিনিসপত্র পরিবারের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তার ভাষ্য, নৌকাডুবির সময় তাদের পাসপোর্টসহ প্রয়োজনীয় কিছু কাগজপত্রও হারিয়ে যায়। ফলে বিকল্প ব্যবস্থায় দেশে ফেরার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়েছে। বাংলাদেশে নিউজিল্যান্ডের কোনো দূতাবাস না থাকায় শ্রীলঙ্কায় অবস্থিত দূতাবাসের সঙ্গে অনলাইন ও ভার্চ্যুয়াল যোগাযোগের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তাসনীম জাহান বলেন, ২৫ আগস্ট সকালে ‘আইল্যান্ড গার্ল’ নিয়ে চট্টগ্রামের উদ্দেশে যাত্রা করেছিলেন পরিবারের সদস্যরা। নাজিরারটেক থেকে কিছু দূরে মহেশখালী চ্যানেলের মোহনায় সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বড় ঢেউ ও তীব্র স্রোতের কবলে পড়ে নৌযানটি। চারজনই সাগরে পড়ে যান। স্থানীয় জেলেরা দ্রুত এগিয়ে গিয়ে জন এডওয়ার্ড, বেলা ও রালফকে উদ্ধার করেন। আলবার্টকে খুঁজে না পেয়ে কোস্টগার্ড, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, লাইফগার্ড ও স্থানীয় জেলেরা সাগর ও উপকূলে তল্লাশি শুরু করেন।
পরদিন বুধবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে সমিতিপাড়া উপকূলে একটি মরদেহ ভাসতে দেখেন স্থানীয়রা। পরে সেটি আলবার্টের বলে শনাক্ত হয়। কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী বলেন, মরদেহ উদ্ধারের পর আইনগত প্রক্রিয়া ও ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা হয়। পরে পুলিশের উপস্থিতিতে কক্সবাজারের একটি শ্মশানে আলবার্টের দাহকর্ম সম্পন্ন হয়েছে।
আলবার্টের মৃত্যুর সঙ্গে পরিবারের বহুদিনের সমুদ্রভ্রমণের স্বপ্নও থেমে গেছে। জন এডওয়ার্ডের পরিকল্পনা ছিল পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নিজেদের তৈরি নৌযানে সমুদ্রপথে বিশ্বভ্রমণ করা। দীর্ঘ যাত্রা শেষে নিউজিল্যান্ডে ফেরার পরিকল্পনা ছিল তাদের।
কোস্টগার্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে পর্যটক ভিসায় পরিবার নিয়ে বাংলাদেশে আসেন জন এডওয়ার্ড। পরে নৌযান তৈরির জন্য কক্সবাজারকে বেছে নেন তিনি। নাজিরারটেকের বাসিন্দা দিদারুল ইসলাম রুবেল বলেছেন, কক্সবাজার শহরের এস এম পাড়া এলাকায় স্থানীয় কারিগরদের সহযোগিতায় নৌযানটির নির্মাণ শুরু হয়। প্রায় দুই বছর ধরে চলে নির্মাণকাজ। এতে অন্তত এক কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলে দাবি তার।
রুবেলের ভাষ্য, ‘আইল্যান্ড গার্ল’ এ দীর্ঘদিন সমুদ্রে থাকার উপযোগী ব্যবস্থা ছিল। শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষ, ফ্রিজ ও রান্নাঘরসহ বিভিন্ন সুবিধা রাখা হয়েছিল এতে। নুনিয়াছড়া বিআইডব্লিউটিএ জেটির বিপরীতে বাঁকখালী নদীতে প্রায়ই নোঙর করে রাখা হতো নৌযানটি। এখন সেই নৌযান ডুবন্ত অবস্থায় পড়ে আছে নদীতে। অথচ তার যাত্রীদের স্বপ্নের যাত্রা শেষ হয়ে গেছে অনেক আগেই।
পরিবারটির সমুদ্রযাত্রা নিয়ে আগেই উদ্বেগ জানিয়েছিল কোস্টগার্ড। কোস্টগার্ড পূর্ব জোনের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন বলেছেন, নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি বিবেচনায় পরিবারটিকে সমুদ্রযাত্রা থেকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছিল। গত ১ মার্চ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নির্দেশনাও দেওয়া হয়।
তিনি জানান, এরপর ৭ এপ্রিল বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে মহেশখালী চ্যানেল অতিক্রমের সময় ‘আইল্যান্ড গার্ল’ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরিবারটি সোনাদিয়ায় আশ্রয় নিলে রাতে তাদের ওপর দুর্বৃত্তরা হামলা চালায়। ক্যামেরা, মোবাইল ফোন, পাসপোর্ট, ডলারসহ বিভিন্ন মালামাল লুট করা হয়। ১০ এপ্রিল কোস্টগার্ড তাদের উদ্ধার করে এবং অভিযান চালিয়ে অধিকাংশ মালামাল উদ্ধার করে। পরে নৌযানটি ডকইয়ার্ডে নিয়ে মেরামত করা হয়।
কোস্টগার্ডের এই কর্মকর্তার ভাষ্য, এরপরও থামেনি পরিবারের সমুদ্রযাত্রার স্বপ্ন। সবার অগোচরে ২৫ আগস্ট আবারও সাগরে নামেন তারা। কিন্তু এবার আর চারজন একসঙ্গে ফিরতে পারলেন না।
জীবিত উদ্ধার হওয়া রালফের ভাষ্য অনুযায়ী, ভিসার মেয়াদসংক্রান্ত বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে তারা সমুদ্রপথে চট্টগ্রামের দিকে যাচ্ছিলেন। মহেশখালী চ্যানেলের মোহনায় পৌঁছানোর পর বড় ঢেউ ও তীব্র স্রোতের মুখে পড়ে নৌযানটি।
স্থানীয় জেলে আব্দুর রহমান বললেন, দুটি কাঠের নৌযান জোড়া দিয়ে ‘আইল্যান্ড গার্ল’ তৈরি করা হয়েছিল। বড় ঢেউয়ের ধাক্কায় সংযোগস্থল বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি অংশ দ্রুত ডুবে যায়। কয়েক মিনিটের মধ্যে অপর অংশটিও তলিয়ে যায়।
রালফের ধারণা, আলবার্টের লাইফ জ্যাকেটের ক্লিপ ঠিকভাবে আটকানো ছিল না। আলবার্ট সাঁতার জানতেন না এবং তিনি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ছিলেন।
কক্সবাজার থেকে নিউজিল্যান্ডের সম্ভাব্য সমুদ্রপথ প্রায় ১১ হাজার কিলোমিটার। সেই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পরিবারের চারজনের একসঙ্গে দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু কয়েক মিনিটের এক দুর্ঘটনা বদলে দিয়েছে পুরো গল্প। এখন সেই পথের যাত্রা শুরু হবে তিনজনকে নিয়ে, একজনকে চিরতরে কক্সবাজারে রেখে।
কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্যসচিব এইচ এম নজরুল ইসলামের ভাষ্য, জন এডওয়ার্ড, তার স্ত্রী বেলা ও রালফ দেশে ফিরবেন। কিন্তু বিদেশি নাগরিকদের এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রা দীর্ঘদিন কীভাবে চলেছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারিতে কোনো ঘাটতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তার প্রশ্ন, কক্সবাজার উপকূলে এমন ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রা কীভাবে সম্ভব হলো? একটি পরিবারের স্বপ্নের যাত্রা যখন একটি সন্তানের মৃত্যুতে থেমে যায়, তখন সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে না।





