ঐতিহ্যের শীতল পাটিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন হাওর অঞ্চলের কারিগররা

শীতল ও জামদানি পাটি তৈরিরত অবস্থায় ক্ষুদ্র কুটির শিল্প নারীরা
কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে হাওর অঞ্চলের গ্রাম বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্যবাহী লোকাচারে জীবনের ক্ষুদ্র কুটির শিল্প শীতল ও জামদানি পাটি। চলতি বছরের এপ্রিল ও মে মাসের টানা ভারী বৃষ্টিপাত ঢলে সৃষ্ট আগাম বন্যার থাবায় ক্ষতির মুখে ঝিমিয়ে পড়েছেন নেত্রকোনার মোহনগঞ্জের কৃষক, জেলেসহ শীতল পাটির ক্ষুদ্র কুটির শিল্পীরা। পাটি তৈরির কাঁচা মাল মুর্তার দাম বৃদ্ধি, স্থানীয়ভাবে পাটির দাম ও ক্রেতা কমে যাওয়া সহ নানাবিধ প্রতিবন্ধকতায় তারা শীতল পাটি তৈরিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। এতে করে এ শিল্পের ওপর নির্ভরশীল অনেক পরিবার নিতান্তকষ্টে দিন যাপন করছেন।
তবে সঠিক সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন বলে জানিয়েছেন এখানকার শীতল পাটির ক্ষুদ্র শিল্পীরা।
হাওরবেষ্টিত নেত্রকোনার মোহনগঞ্জের ডিঙাপোতা হাওরপাড়ের হাতনী, ভাটাপাড়া, জৈনপুর, কেন্দুয়া, নোয়াগাঁও, হরিপুর ও পাশ্ববর্তী সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা উপজেলার তাহেরপুরের গ্রামে যুগ যুগ ধরে এই শীতল পাটি তৈরি করে জীবন জীবিকা চালাচ্ছেন এখানকার নিম্ন আয়ের অনেক মানুষ।
বর্তমানে বাজারে প্লাস্টিকের পাটির দাপটে মুর্তার তৈরি শীতল পাটি অনেকটাই জৌলুস হারাচ্ছে। এ পাটি এক সময় প্রয়োজনে ব্যবহার করলেও এখন আর আগের মতো নেই। শুধু সখের বসেই মানুষ শীতল পাটি ব্যবহার করেন।
প্রথমে পরিপক্ক মুর্তা গাছ কেটে কিছুদিন পানিতে ভিজিয়ে তারপর পাটির বেত তোলা হয়। এরপর রান্না করা ভাতের মাড় ও পানি মিশিয়ে সেই বেত আগুনে দিয়ে জ্বাল দেওয়া হয়। এর ফলে বেত হয়ে ওঠে মসৃণ ও সাদাটে। বেতের ওপরের খোলস থেকে শীতলপাটি, জামদানীপাটি, পরের অংশ তুলে বুকার পাটি এবং অবশিষ্ট অংশ চিকন দড়ি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
আজ বৃহস্পতিবার উপজেলার ভাটাপাড়া গ্রামে সরজমিন দেখা যায়, নারী-পুরুষ শীতল ও জামদানি পাটি তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। পুরুষদের তুলনায় নারীরাই এই কাজে বেশি দক্ষ। নারীরা সাংসারিক কাজ সামলিয়ে বাকি সময়টা তারা পাটি তৈরির কাজ করেন।
স্থানীয়ভাবে পাটি তৈরির কাঁচামাল মুর্তার চাষ হলেও তা যতেষ্ট না হওয়ায় পুরুষরা নেত্রকোনা জেলার বিভিন্ন উপজেলার বাজারে গিয়ে ঘুরে ঘুরে মুর্তা সংগ্রহ করেন।
উপজেলার ৩ নম্বর তেতুলিয়া ইউনিয়নের ভাটাপাড়া গ্রামের সবিতা রানী কর, পার্থনা রানী কর, সাধনা রানী কর, একই ইউনিয়নের জৈনপুর গ্রামের কমলা বনিক, ফুলন তালুকদার তারা শীতল পাটি তৈরি করেই তারা জীবিকা নির্বাহ করেন।
ভাটাপাড়া গ্রামের বিপ্লব কর বলেন, আমাদের একটি শীতলপাটি তৈরি করতে সময় লাগে কমপক্ষে ৭ থেকে ৮ দিন। প্রতিটি পাটির কাঁচামাল ক্রয় করতে ব্যয় হয় প্রায় ৪’শ থেকে ৫’শ টাকা। সেই পাটি সোমবার ও শুক্রবার স্থানীয় উকিল মুন্সি হাটে নিয়ে ৮'শ থেকে সাড়ে ৮'শ টাকা বিক্রি করি। পাটি বিক্রি করে প্রতি মাসে আমাদের তিন থেকে চার হাজার টাকা ইনকাম হয়। সরকার যদি আমাদেরকে একটু সাহায্য সহযোগিত অথবা কম সুদে ক্ষুদ্রঋণ দিত তাহলে সুন্দর একটা কুটির শিল্প ধরেরাখা সম্ভব হতো। সেই পাটি আবার
দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাইকাররা এসে বাড়ি থেকে নিয়ে যায়।
পাটি তৈরির কারিগরেরা জানান, পাটি তৈরির কাঁচামাল মুর্তা মূলত বর্ষা মৌসুমেই বেশি সংগ্রহ করা হয়। কারণ এই সময়ে নৌকায় কম খরচে পরিবহন করা যায়। নিজেদের অর্থনৈতিক অবস্থা ভাল না হওয়ায় দাদন ব্যবসায়ীদের থেকে সুদে টাকা নিয়ে মুর্তা ক্রয় করি। বছর শেষে দাদন ব্যবসায়ীদের টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে দিশেহারা হতে হয়। অনেক সময় দেখা যায় এক দাদন ব্যবসায়ীর ঋণের টাকা পরিশোধ করতে অন্য দাদন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ঋণ নিতে হয়।
শীতল পাটির কারিগর সবিতা রানী কর আগামীর সময় বলেন, শীতল ও জামদানি পাটি তৈরিতে অনেক সময় ও শ্রম দিতে হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে খরচও আগের চেয়ে অনেক বেশি লাগে। এদিকে বিক্রি করতে গিয়ে দাম আগের মতোই। ফলে শীতল পাটি তৈরির আগ্রহ দিন দিন কমে যাচ্ছে। বাপ দাদার আমলের এই কাজ এখন ছাড়তেও পারছি না। শুধু খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকার তাগিদে আর বংশপরম্পরায় চলে আসা ঐতিহ্য হিসেবে এ কাজে ঠিকে আছি। এরই মধ্যে অনেকেই পেটের তাগিদে এই পেশা ছেড়ে দিয়েছে।
শীতল পাটি তৈরির কারিগররা আরও জানান, অর্থনৈতিকভাবে লাভবান না হওয়ায় অনেকে এ পেশা থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে। শীতল পাটির কারিগর দিন দিন কমে যাচ্ছে। আগে শীতল পাটির উপকরণ মুর্তা কেনা লাগতো না। এগুলো আগাছার মতো যেখানে সেখানে জন্মাত। কারিগররা সেগুলো সংগ্রহ করে পাটি বুনত। শুধু সময় ও পরিশ্রমের দাম হিসেবে এগুলোর মূল্য নির্ধারিত হতো। কিন্তু আজকের পরিবর্তিত সময়ে সবার মাঝে আর্থিক সচেতনতা এসে গেছে। তাছাড়া বর্তমানে মুর্তা ক্রমশ কমে যাচ্ছে। তাই বছরের নির্দিষ্ট সময়ে সারাবছরের পাটি তৈরির জন্য মুর্তা কিনে রাখতে হয়। ফলে মুর্তা কেনার টাকার জন্য দাদন কারবারিদের দারস্থ হতে হয়।
সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করে কারিগরেরা বলেন, বাংলাদেশের অন্যান্য হস্তশিল্পের মতোই এ ক্ষুদ্র কুটির শিল্পের শিল্পীরা দরিদ্র ও অবহেলিত। সরকারের এ শিল্পের দিকে একটু নজর দেওয়া উচিত। বিশ্বের দরবারে সম্মান সূচক মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়েছে এ শিল্প। সারাবিশ্বে এ শীতল পাটি শিল্পের শিল্পীদের কাজে পারদর্শিতার নৈপুণ্য ও শিল্পসত্তার ভুয়সী প্রশংসা অর্জন করেছে। যদিও আমরা এখানে পিছিয়ে আছি।
স্থানীয়রা জানান, শীতল ও জামদানি পাটি তৈরির মূল কাঁচামাল মুর্তার বেত দিয়ে তৈরিতে করতে অনেক পরিশ্রমের প্রয়োজন। পরিশ্রমের অনুয়ায়ী তারা আগের মতো বাজার দর ভালো না হওয়ায় দিন দিন একেবারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন পাটি তৈরির কারিগররা।
শীতল পাটি তৈরির কারীগর
পার্থনা রানী কর বলেন, বাপ দাদার আমলের এই পেশা। এক সময় পাটি তৈরি করে ভাল আয় হতো। এখন আর সেই সুদিন নেই। জমির ধান বন্যায় নিয়ে গেছে। সংকটের কারণে শীতল পাটি বিক্রি করে তেমন পারিশ্রমিক আসে নাই।
ক্ষুদ্র কুটির শিল্পটি রক্ষায় সরকারি পৃষ্টপোষকতা পেলে আবার ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব। পাশাপাাশি কোনো মাধ্যম ছাড়া আমারা কারিগরেরা যেন ব্যবসায়ী বা ক্রেতাদের কাছে ন্যায্য দামে বিক্রি করতে পারি সেই ব্যবস্থা করে দেওয়া। এর জন্যে প্রচার প্রসার বাড়ানো। এতে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের হবে।'
ক্ষুদ্র কুটির শিল্প শীতল পাটি বাংলার সুপ্রাচীন এক কুটির শিল্পের নাম। শীতল পাটি সভ্যতা, কৃষ্টিয় ঐতিহ্যের অংশ। এ ছাড়া বাংলাদেশের শীতল পাটি এখন বিশ্ব ঐতিহ্যেরও অংশ।
মোহনগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমেনা খাতুন আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, শীতল পাটি আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কাঁচামালের সংকট, শুনেছি উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় কারিগরেরা সমস্যায় পড়ছেন। এ শিল্প টিকিয়ে রাখতে আর্থিক সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ ও বাজারজাতকরণের সুযোগ বাড়ানোর বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হবে।



