দখল-দূষণে মৃতপ্রায় সোনারগাঁয়ের ঐতিহাসিক মারিখালী নদ

দখল-দূষণে জৌলুস হারিয়ে ফেলেছে মারিখালী নদ। ছবি: আগামীর সময়
সোনারগাঁয়ের ইতিহাস, বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে জড়িয়ে আছে মারিখালী নদ। একসময় এ নদপথে বড় বড় বজরা ও গহনা নৌকায় মেঘনা হয়ে ঐতিহাসিক পানাম নগরীতে যাতায়াত করতেন বণিক ও ধনীরা।
সোনারগাঁয়ের বিশ্বখ্যাত সূক্ষ্ম মসলিনও এ নদপথে মেঘনা হয়ে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যেত। সেই খরস্রোতা ও ব্যস্ত নদ এখন দখল, দূষণ ও নাব্যতা সংকটে মৃতপ্রায়।
প্রায় ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ও গড়ে ৪২ মিটার প্রশস্ত মারিখালী নদটি এখন সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এতে স্বাভাবিক জলপ্রবাহ ও নৌচলাচল ব্যাহত হচ্ছে মারাত্মকভাবে।
নদটির ওপর বিভিন্ন স্থানে সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) নির্মাণ করেছে সাতটি সেতু। এর মধ্যে পাঁচটি সেতু পর্যাপ্ত উচ্চতায় নির্মিত না হওয়ায় বর্ষাকালে পানি বাড়লে চলাচল করতে পারে না মালবাহী ও যাত্রীবাহী ট্রলার, লঞ্চ ও স্টিমার।
জানা গেছে, উপজেলার বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নের মেঘনা নদীর কোল ঘেঁষে মারিখালী নদটির শুরু। সোনারগাঁ পৌরসভা, পিরোজপুর ও মোগরাপাড়া ইউনিয়নের কাইকারটেক ঐতিহাসিক হাটের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে নদটি ব্রহ্মপুত্র নদে গিয়ে মিশেছে। উপজেলার চারটি ইউনিয়ন ও পৌরসভার বিভিন্ন এলাকার বৃষ্টির পানিও গিয়ে পড়ে এ নদে।
দূষণের কারণে দুর্ভোগে পড়েছেন নদটির ওপর নির্ভরশীল প্রায় ৩৫টি গ্রামের প্রায় ৫০ হাজার মানুষ। এসব এলাকার বাসিন্দারা পানিবাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
পিরোজপুর ইউনিয়নের জিয়ানগর গ্রামের গৃহবধূ সানোয়ারা বেগম বলেছেন, ‘এই এলাকায় বড় হয়েছি আমরা। ছোটবেলায় এ নদে গোসল করতাম। এ নদের পানি রান্নার কাজে ব্যবহার করতাম। নদটির দুই পাশে গড়ে ওঠা বিভিন্ন কলকারখানার বর্জ্য সরাসরি নদে পড়ছে। এতে পানি মারাত্মকভাবে দূষিত হয়েছে। এখন এ পানি ব্যবহার করা যায় না। গায়ে লাগলে চুলকানি হয়।’
সোনারগাঁ পৌরসভার রঘুভাঙ্গা গ্রামের স্বাধীন চন্দ্র দাস বলেছেন, ‘এ নদ দিয়ে বড় বড় ট্রলার চলতে দেখেছি। এখন শুষ্ক মৌসুমে ছোট নৌকাও চলতে পারে না। নদটির দুই পাশে দখলের কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। নদটির আগের জৌলুস আর নেই।’
মোগরাপাড়া ইউনিয়নের খুলিয়াপাড়া গ্রামের নুরুজ্জামান প্রধান জানিয়েছেন, কয়েক বছর আগেও নদটিতে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। দূষণের কারণে এখন আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না। নদটির পানিও ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। তিনি নদটি দখল ও দূষণের হাত থেকে রক্ষায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসিফ আল জিনাত জানিয়েছেন, মারিখালী নদকে দখল ও দূষণমুক্ত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। খুব শিগগিরই এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নান জানিয়েছেন, দখলের পাশাপাশি নদটিতে পলি জমে নাব্যতা কমেছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় ইতিমধ্যে খাল খননের কাজ শুরু হয়েছে।
মারিখালী নদ খননের জন্য শিগগিরই বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) কাছে ডিও লেটার দেওয়া হবে। খনন করা হলে নদটির নাব্যতা ফিরবে এবং পানি দূষণমুক্ত করার উদ্যোগও নেওয়া হবে। পাশাপাশি দখলদারদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কবি, পরিবেশকর্মী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শাহেদ কায়েস বলেছেন, ‘সোনারগাঁয়ের ইতিহাস ও জনজীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মারিখালী নদ আজ দখল, দূষণ ও নাব্যতা হারিয়ে বিলীন হওয়ার পথে। একটি নদ হারিয়ে যাওয়া শুধু জলধারার মৃত্যু নয়, এর সঙ্গে জনপদের স্মৃতি, জীববৈচিত্র্য ও স্বাভাবিক জলপ্রবাহও হারিয়ে যায়। মারিখালীকে রক্ষায় দ্রুত দখলমুক্ত করা, দূষণ বন্ধ এবং পরিকল্পিতভাবে নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে সরকার, স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।’





