সৌদিতে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৭, বাংলাদেশি পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সৌদির জেদ্দায় ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় শিশুসহ সাতজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ছয়জন। হতাহত ১৩ জনের সবার স্থায়ী ঠিকানা কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলায়। তারা তিন পরিবারের সদস্য। তবে নিহতদের পরিচয় নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে ভিন্ন দাবি উঠেছে।
স্থানীয় এক বাসিন্দার দাবি, আলম শাহের পরিবার পুরনো রোহিঙ্গা। তার নিহত স্ত্রী সানজিদাও রোহিঙ্গা। এ নিয়ে এলাকায় আলোচনা তৈরি হলেও প্রশাসন ও পুলিশের কাছে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য পৌঁছায়নি।
গতকাল শনিবার ভোরে মদিনা থেকে জেদ্দায় ফেরার পথে আল-হিমনা এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতরা বাংলাদেশি মালিকানাধীন আল-আবির কোল্ড স্টোর কোম্পানির কর্মী। তারা পরিবারসহ মদিনা জিয়ারত শেষে একটি গাড়িতে করে জেদ্দায় ফিরছিলেন। পথে পেছন থেকে একটি ট্রাক গাড়িটিকে ধাক্কা দিলে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে।
জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট থেকে ঢাকায় পাঠানো প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্ঘটনাকবলিত গাড়িতে আল-আবির কোল্ড স্টোরে কর্মরত চার বাংলাদেশি ও তাদের পরিবারের সদস্যসহ ১৩ জন ছিলেন। তাদের মধ্যে সাতজন নিহত এবং ছয়জন আহত হয়েছেন।
নিহতদের মধ্যে রয়েছেন কক্সবাজারের উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের বাসিন্দা জিয়াউর রহমান (৪৫)। তিনি আল-আবিরের জেদ্দা শাখায় স্টোরকিপার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। দুর্ঘটনায় তার দুই ছেলে ইয়াসির ও ইয়াযান এবং মেয়ে বুশরা মারা গেছে। তার স্ত্রী শাকিরা ও আরেক মেয়ে ইউসরা আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
একই দুর্ঘটনায় টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের পূর্ব সিকদারপাড়া এলাকার বাসিন্দা আলম শাহ তার স্ত্রী সানজিদা ও এক মাস বয়সী মেয়ে ফারিয়াকে হারিয়েছেন। আলম শাহ ও তার ছেলে ফয়সাল আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ ছাড়া আল-আবির কোল্ড স্টোরের ফর্কলিফট চালক ইলিয়াসের স্ত্রী আফসানা বিবি নিহত হয়েছেন। তার বাড়িও টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নে। আহত অন্যজন গফুর আলম।
আল-আবির কোল্ড স্টোরের ব্যবস্থাপক (বিপণন) মোহাম্মদ নুরুজ্জামান বলেছেন, ‘আল-আবির কোল্ড স্টোরের ১৩ জন একই সঙ্গে মদিনা থেকে জিয়ারত শেষে জেদ্দায় ফিরছিলেন। পথিমধ্যে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় সাতজন প্রাণ হারান এবং ছয়জন গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।’
নিহত সানজিদার ভাই শাহীন সামি বাংলাদেশ কনস্যুলেটকে বলেছেন, ‘জেদ্দায় হাইওয়েতে সড়ক দুর্ঘটনায় আমার বোন সানজিদা ও ভাগনি মারা গেছে। পরিবারের আরও দুজন বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ওনাদের জন্য সবাই দোয়া করবেন।’
সৌদি ট্রাফিক দপ্তরের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, দুর্ঘটনার সময় গাড়িটির গতিবেগ ঘণ্টায় আনুমানিক ১৬০ কিলোমিটার ছিল। অতিরিক্ত গতির কারণে গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যায় বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে তদন্ত শেষে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।
এদিকে দুর্ঘটনায় নিহত আলম শাহের পরিবারের পরিচয় নিয়ে ভিন্ন দাবি করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা হুমায়ুন কবির। তার ভাষ্য, আলম শাহের পরিবার পুরনো রোহিঙ্গা। নব্বইয়ের দশকে তারা বাংলাদেশে আসেন। এরপর পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে বসবাস করছেন। টেকনাফের হ্নীলায় তাদের নিজস্ব বাড়িঘর বা স্থায়ী বসতি নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
হুমায়ুন কবিরের দাবি, আলম শাহের পাসপোর্টে টেকনাফের হ্নীলার ঠিকানা উল্লেখ থাকায় তাকে বাংলাদেশি হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়েছে। নিহত সানজিদাও রোহিঙ্গা বলে দাবি তার। ২০১৭ সালে সানজিদা হ্নীলার একটি রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পরে সৌদি আরবে গিয়ে আলম শাহ তাকে বিয়ে করেন এবং সঙ্গে নিয়ে যান বলে জানান তিনি।
তবে এ বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের কাছে কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য নেই। টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আতিকুর রহমান বলেন, ‘সৌদি আরবের সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের বিষয় নিয়ে দূতাবাস ও বাংলাদেশের আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে এখন পর্যন্ত কেউ আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি।’
টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, এ ধরনের ঘটনায় কেউ কোনো অভিযোগ করেননি বা এ বিষয়ে কিছু জানতে চাননি।
হ্নীলা ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনার কোনো খোঁজখবর আমাদের হাতে আসেনি। তারপরও এলাকার মানুষের কাছ থেকে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।’
আল-আবির কোল্ড স্টোরের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ নুরুজ্জামান জানিয়েছেন, দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে বসবাস করে আসছে। নিহতদের মরদেহ সৌদি আরবেই দাফন করা হবে।



