জামরুম ঝরনা, গহিন পাহাড়ের নীরব সৌন্দর্যের কাছে

পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা স্বচ্ছ জলধারা। কোথাও পাথুরে খাত, কোথাও ঘন বাঁশবন, আবার কোথাও অন্ধকার অরণ্যের বুক চিরে এগিয়ে যাওয়া সরু ট্রেইল। চারপাশে নীরবতা, কেবল ঝিররির পানির শব্দ। দুর্গম সেই পাহাড়ি পথ পেরিয়ে হঠাৎ চোখের সামনে ধরা দেয় বহু ধাপের জলপ্রপাত—জামরুম ঝরনা। বান্দরবানের আলীকদমের গহিন অরণ্যে লুকিয়ে থাকা এই ঝরনা এখনো সাধারণ পর্যটকের ভিড় থেকে অনেকটাই দূরে।
জামরুম মূলত ট্রেকারদের জন্য একটি কঠিন গন্তব্য। পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে এর সঙ্গে পালংখিয়াং, লাদমেরাগ ও থানকোয়াইন ঝরনার ট্রেইলও যুক্ত। ফলে একটি দীর্ঘ ট্রেকিং অভিযানে একাধিক ঝরনার সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগ মেলে।
জামরুমের পথে যেতে হলে প্রথমে আলীকদম পানবাজারে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে হয়। স্থানীয় অভিজ্ঞ গাইড সঙ্গে নেওয়া জরুরি। এরপর ১৩ কিলোমিটার পয়েন্ট অথবা আমতলী হয়ে যাত্রা শুরু করা যায়। আমতলী থেকে তৈন খাল ধরে নৌপথে দুছড়ী বাজারে পৌঁছানোর পথটিও কম আকর্ষণীয় নয়। পাহাড়ঘেরা খালের বুক চিরে নৌযাত্রার পর শুরু হয় মূল ট্রেকিং।
দুছড়ী থেকে পালংখিয়াংয়ের পথে পাথুরে ঝিরি, পিচ্ছিল পথ ও ঘন জঙ্গল পেরোতে হয়। এরপর লাদমেরাগ অতিক্রম করে আরও দুর্গম পাহাড়ি পথে এগিয়ে যেতে হয় জামরুমের দিকে। কোথাও খাড়া ঢাল, কোথাও সরু গিরিখাত, আবার কোথাও বাঁশবনের ভেতর দিয়ে পথ। দীর্ঘ হাঁটার ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয় ঝরনার কাছে পৌঁছানোর মুহূর্তটি।
এ ভ্রমণে রাত কাটাতে হতে পারে স্থানীয় পাহাড়ি পাড়ার মাচাংঘর বা জুমঘরে। স্থানীয় পরিবারের রান্না করা পাহাড়ি খাবার হয়ে উঠতে পারে ভ্রমণের অন্যতম অভিজ্ঞতা। পুরো যাত্রায় সাধারণত তিন থেকে চার দিন সময় হাতে রাখা ভালো।
তবে জামরুম কোনো সহজ গন্তব্য নয়। বর্ষায় ঝরনা প্রাণ ফিরে পেলেও পাহাড়ি ঢল, পিচ্ছিল পাথর ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি থাকে। আবার শুষ্ক মৌসুমে ঝরনার পানিপ্রবাহ কমে যেতে পারে। তাই আবহাওয়া ও স্থানীয় পরিস্থিতি জেনে যাত্রা করা জরুরি।
জামরুমের সৌন্দর্য তার দুর্গমতা ও নির্জনতায়। সেই সৌন্দর্য ধরে রাখতে ভ্রমণকারীদের দায়িত্বশীল হতে হবে। প্লাস্টিক বা বর্জ্য না ফেলা, স্থানীয় মানুষের অনুমতি নিয়ে ছবি তোলা এবং পাহাড়ি পরিবেশের প্রতি সম্মান দেখানো—এই কয়েকটি সচেতনতাই পারে গহিন অরণ্যের এই জলধারাকে দীর্ঘদিন অক্ষত রাখতে।
পাহাড়ের নীরবতার ভেতর জলধারার অবিরাম শব্দ—জামরুম তাই শুধু একটি ঝরনা নয়, বরং দুর্গম পাহাড়ের বুকের এক অনাবিল প্রকৃতি-অভিজ্ঞতার নাম।




