আগে নির্বাচন এলেই ইউএনও-ওসিরা পেতেন ১ কোটি টাকা: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

মানিকগঞ্জে ডিসি কার্যালয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন বকুল। ছবি: আগামীর সময়
গত ১৭ বছরে দুর্নীতি সবার রন্ধ্রে রন্ধ্রে পৌঁছে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন বকুল। এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে সবাইকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
আজ সোমবার দুপুরে মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এক সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন মন্ত্রী। সেখানে তিনি বলেছেন, ‘এই দুর্নীতি গত ১৭ বছরে কঠিনভাবে বাসা বেঁধেছে। নির্বাচন আসলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) পেতেন ১ কোটি, থানার ওসি পেতেন ১ কোটি, ডিসিও পেতেন। মহারণ্য ছিল ঘুষ-দুর্নীতির।’
‘এবার নির্বাচন হয়েছে, কেউ কি ১০ টাকাও পেয়েছেন? আমি শুনি নাই। আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। কারণ আমরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েছি। দুর্নীতিতে পড়ে যাওয়া অর্থগুলো দেশের জনগণের কল্যাণে বিনিয়োগ করতে হবে। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে থেকে দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। এজন্য সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে‘— বললেন তিনি।
‘দেশটাকে বাঁচাতে হলে দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে, সমাজ থেকে মাদককে না বলতে হবে। আমাদের ছেলেমেয়েদের ধ্বংসের মুখ থেকে রক্ষা করতে হলে জুয়া, মাদকসহ সব ধরনের অপরাধকে রুখতে সবাইকে কাজ করতে হবে এবং চিকিৎসাব্যবস্থা উন্নত করতে হবে’— মনে করেন মন্ত্রী।
ডিসি কার্যালয়ে আইনশৃঙ্খলা, উন্নয়নমূলক ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম সমন্বয়ে এই বিশেষ সভা হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বললেন, ‘বিগত সময়ে হাসপাতালে রোগীদের ১৭৫ টাকার খাবার দেওয়া হতো। কিন্তু বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরে প্রত্যেকে রোগীর জন্য ২৫০ টাকার খাবারের ব্যবস্থা করেছি। এ ছাড়া হাসপাতালের বিগত দিনের চেয়ে বর্তমানে খাবার মানও অনেক ভালো হয়েছে। পাশাপাশি বিশেষ দিনে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের জন্য উন্নত খাবারের ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে।’
প্রান্তিক স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা জানিয়ে তিনি বললেন, ‘সারা দেশের প্রতিটি ইউনিয়নের স্বাস্থ্য ও সুস্থতা কেন্দ্র (হেলথ অ্যান্ড ওয়েলবিয়িং) স্থাপন করা হবে এবং সারা দেশে ৪২ হাাজার ৩৯০ জন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে। যাতে তারা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে পারে। এতে নারীদের ব্রেস্ট ক্যানসারের মতো রোগ নির্ণয় করতে সুবিধা হবে এবং মৃত্যুহারও কমবে। এ ছাড়া দেশের প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৫০ শয্যা থেকে উন্নীত করে ১৫১ শয্যা করা হবে।’
হাম পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তার ভাষ্য, ‘ফ্যাসিস্ট সরকার ১৭ বছরে হামের প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য প্রতি চার বছর পর পর একবার করে টিকা প্রদান কর্মসূচি করার কথা থাকলেও তা করা হয়নি। তারা কোনো টিকা মজুদও রেখে যায়নি, টাকাও রেখে যায়নি। ফ্যাসিবাদের পতনের পর দেশের ইউনিসেফ অন্তর্বর্তী সরকারকে তিনবার অনুরোধ করছিল— হামের টিকা ক্যাম্পেইনিং করার জন্য। কিন্তু ইউনূস সরকার তাতে কোনো কর্ণপাত করে নাই। তারা ইউনিসেফের কাছ থেকে টিকা না কিনে খোলা দরপত্রের মাধ্যমে কিনতে চেয়েছিল।’
‘কিন্তু বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই এ হামের বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা হয়েছে। স্টোরে খোঁজ নিয়ে দেখা গেলে, কোনো ভ্যাকসিন ও টাকা নেই। দ্রুত প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে বিশ্বব্যাংক, ইউনিসেফ ও গ্যাবি তাদের ডেকে অনুরোধ করেছি যে দ্রুত হামের ভ্যাকসিন সরবরাহ করার জন্য। মাত্র ২১ দিনের মধ্যে ভ্যাকসিন এনে হামের রোগীসহ সারা দেশে হামের ভ্যাকসিন ক্যাম্পেইনিং করেছি। আমাদের লক্ষ্য ছিল ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে হামের টিকা প্রদান করা। তবে দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচির আওতায় ১ কোটি ৭২ লাখের বেশি শিশুকে হামের টিকা দেওয়া হয়েছে’— বললেন সরদার মোহাম্মদ সাখাওয়াত।
দেশে সার সংকট প্রসঙ্গে মন্ত্রী জানালেন, গত বছরের তুলনায় চলতি বছর পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। তার দাবি, ‘একটি মহল দেশে সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছিল। এখনো কিছুটা সমস্যা আছে। ফ্যাসিবাদের আমলের যারা সারের ডিলার ছিল, আমরা কিন্তু তাদের কাউকেই বাদ দিইনি। তারাই এই সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দেশের জনগণের কাছে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে চেয়েছিল।’
‘বিষয়টি আমাদের নজরে আসার পরপরই প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমান আমাদের নিয়ে সভা করেন এবং সমস্যা সমাধানের জন্য দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে একজন করে সারের নতুন ডিলার নিয়োগের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।’
‘ফ্যাসিস্টের দোসররাই’ সরকারকে ব্যর্থ করতে বিভিন্ন সংকট তৈরি করছে বলে মনে করেন মন্ত্রী।
‘তারা প্রথমে জ্বালানি সংকট তৈরি করে জনগণকে ভোগান্তিতে ফেলতে চেয়েছিল। তাদের একটি মোটরসাইকেলের চক্র ছিল, যারা সারা দিন এক পাম্প থেকে অন্য পাম্পে তেল নিত। এটি বোঝার পরে সরকার কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং এক সপ্তাহের মধ্যে দেশে জ্বালানি সমস্যার সমাধান হয়ে যায়’
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে এলএনজি আমদানিতে সমস্যা হচ্ছে উল্লেখ করে গ্যাস ও বিদ্যুতের সমস্যা দ্রুত সমাধানে সরকার কাজ করছে বলে জানালেন সরদার মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন বকুল।










